প্যালেস্টাইনের কবিতা

Standard

শৈশব – ইব্রাহিম নাসরাল্লাহ্‌

তিনটে ছোট-ছোট স্বপ্ন, একলা
একটা বাড়ীর খোঁজে পার হয়ে
যাচ্ছিল রাত, ঠিক যখন
গোলায় গুঁড়িয়ে গেল বাচ্চাটার বুক

 

স্বভূমি – ইব্রাহিম নাসরাল্লাহ্‌

আমাদের ভোরের জোয়ালের নীচে
গুঁড়ো হয়ে যায় সূর্য
আর পা-ফেলার অন্ধকারে
হাঁফ-নিঃশ্বাসে আগুন ধরে যায়
এই আধখেঁচড়া স্বদেশে
নিজেদের যুদ্ধবন্দী বলে মনে হয়

 

ব্যতিক্রম – মুরীদ বারঘুতি

সকলেই পৌঁছয়;
নদী আর ট্রেন
শব্দ, জাহাজ
আলো ও সংবাদ
সান্ত্বনার টেলিগ্রাম
নেমন্তন্নের চিঠি
দূতাবাসের ডাক
মহাকাশযান
পৌঁছয় সব
থেমে থাকে আমার চলার পথ
আমার দেশের দিকে…

রসেবশে নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত

ভীলেদের গল্প

Standard

(ছোটদের জন্যে)

ভীল কাদের বলে জানো? আমাদের দেশে যত আদিবাসী মানুষ থাকেন, তাঁদের মধ্যে সবথেকে বেশী সংখ্যক মানুষ ভীল গোষ্ঠীর। গুজরাট, মধ্য প্রদেশ, ছত্তিসগড়, মহারাষ্ট্র আর রাজস্থান – এই ক’রাজ্যেই মূলতঃ এঁদের বাস।

ভীলেরা এককালে ছিলেন যাকে বলতে পারো ‘হান্টার-গ্যাদারার’। ছোট ছোট জীবজন্তু শিকার করে, বনের ফলমূল কুড়িয়ে এঁরা নিজেদের পেট ভরাতেন। এ-ছাড়া, বাড়ীতে গরু, ছাগল, মুরগী পালন করেও সংসার চালাতেন কেউ কেউ। ভীলেরা খুবই গরীব মানুষ আসলে। তবু এঁদের হাতের কাজ আর নাচ দেখার মতন। আজকাল অবশ্য চাষবাসই এঁদের মূল পেশা।

এতো গেল এঁদের সম্বন্ধে দু’কথা। এই ভীলগোষ্ঠীর একটা প্রাচীন গল্প আজ তোমাদের শোনাই।

একদিন মহাদেব, মানে আমাদের শিবঠাকুর, আর পার্বতী দুজনে বসে মর্ত্যের হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করছেন। মানে, কি করলে কি হয় এইসব আর কি। এমন সময় পার্বতীর ভাইয়েরা এলেন দিদির সঙ্গে দেখা করতে। ব্যাস, ভাইবোনে এক হলে যা হয়। গল্পে গল্পেই অনেকটা সময় কেটে গেল। এতোটাই, যে ভাইদের চলে যাওয়ার সময় যে কখন হয়ে এসেছে পার্বতী তা খেয়ালই করেন নি। তা, খেয়াল করে মনটা ভারী হল বটে, কিন্তু একটা ভাবনাও পার্বতীর মাথায় এলো। ভাইয়েরা এতোটা পথ উজিয়ে দেখা করতে এল। ওদের তো একটা উপহার-টুপহার কিছু না দিলেই নয়!

কিন্তু কি দেওয়া যায়? এই কৈলাসে সংসার। আর চ্যালাচামুণ্ডা বলতে তো ভূতের দল। স্বামী মহাদেবও তো সর্বত্যাগী। কি করবেন-কি করবেন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কিছুই না পেয়ে পার্বতী সেই মহাদেবেরই দ্বারস্থা হলেন। বললেন – ‘আপনি একটা ব্যবস্থা না করলে তো সম্মান থাকে না’।

মহাদেবও পড়লেন আতান্তরে। তিনি ভিখারী সাধু মানুষ! কোথায় কিই বা পাবেন উপহার দেওয়ার যোগ্য? তা-ছাড়া শালারা সব রাজার ছেলে। তাদের তো দেব বললেই কিছু দেওয়া যায় না! তবু অনেক ভেবেচিন্তে তিনি মনে মনে একখানা রূপোর কলসী তৈরী করে শালাদের বাড়ী ফেরার পথে রেখে দিলেন। কিন্তু পার্বতীর ভাইয়েরা চলে যাওয়ার সময় নিজেদের মধ্যে গপ্পে এতই মশগুল যে সেই কলসী তাদের চোখেই পড়ল না।

পার্বতীর মনের দুঃখ আর ঘোচে না। ভগবান মহাদেবের দেওয়া উপহার ভাইয়েরা দেখল না? কি করা যায় ভাবতে ভাবতে আবার তিনি শিবঠাকুরের শরণ নিলেন। বললেন, ‘আপনি এবার এমন কিছু ওদের দিন যার থেকে শিক্ষা নিয়ে ওরা জীবনে উন্নতি করতে পারে’। মহাদেব বললেন – ‘তথাস্তু’! বলে-টলে তিনি নিজের ষাঁড় নন্দীকেই পাঠিয়ে দিলেন শালাবাবুদের কাছে।

পার্বতী তো মহা খুশী। এতোটা আশা করেন নি তিনি। তিনি তো জানেন, নন্দী মহাদেবের কত প্রিয়। সেই প্রিয় নন্দীকেই তিনি উপহার দিয়ে দিলেন। ভাইদের বললেন – ‘দেখো। আমি তোমাদের দিদি। আমার কথা শোনো। এই ষাঁড় মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয় প্রাণী। খুব মন দিয়ে এর যত্ন কোরো। তোমাদের ভালো হবে। অনেক ধনসম্পদ হবে।’ ভাইয়েরাও মহা খুশী। তারা ড্যাং ড্যাং করে নন্দীকে নিয়ে বাড়ী চলল।

পার্বতীর কথায় তারা নন্দীকে ভালোমন্দ খাওয়ায়, স্নানটান করায়। বেশ যত্নেই রাখে। এমন করে দিন যায় মাস যায়। কিন্তু কিছু পাওয়া যায় না নন্দীর থেকে। কাঁহাতক ধৈর্য রাখা যায়? একটু একটু করে রাগতে রাগতে রাগ একদিন চরমে উঠলে ভাইয়েরা মিলে ফন্দী করল নন্দীকে জবাই করে দেখবে তার ভেতরে সত্যিই কি কি ধনরত্ন লুকোনো আছে। ব্যাস, যেমন কথা তেমন কাজ!

খবর গেল পার্বতীর কানে। সব শুনে তিনি একাধারে ভাইদের নির্বুদ্ধিতা আর লোভের জন্য যেমন লজ্জিত হলেন, তেমন রেগেও গেলেন প্রচণ্ড। তাদের ডেকে এনে তীব্র ভর্ৎসনা করলেন পার্বতী। ‘বোকা ছেলেরা, তোমরা জানো না স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল এই তিন ভুবনের মধ্যে নন্দী সবথেকে শক্তিশালী আর পবিত্র? মহাদেব নন্দীকে তোমাদের কাছে দিয়েছিলেন জমি চাষ করে সোনার ফসল ফলাতে। তা না করে লোভের বশে ওকে তোমরা মেরেই ফেললে? এমন আক্কেল তোমাদের?’ প্রচণ্ড রাগে তিনি অভিশাপ দিলেন ভাইদের, যে তারা বা তাদের বংশের কেউই আর চাষবাস করতে পারবে না।

ভীলেরা মনে করেন তাঁরা দেবী পার্বতীর ভাইয়ের বংশধর। আর তাঁর শাপেই চাষবাস করা তাঁদের হয়ে ওঠে না।

তবে সেই শাপ আজ কেটেছে, কি বলো?

ঐহিক ‘হযবরল’ সংখ্যায় প্রকাশিত

গায়ক সম্বন্ধে মনগড়া ক’টা কথা

Standard

 

2874219370_dc51cd0ed1

দেবব্রত বিশ্বাসকে আমি একবারই দেখেছি।

 

সেটা ১৯৮০ সালের ১৮ই আগস্ট। জগদ্বন্ধু ইশকুলের ক্লাস ফোরে পড়ি মনে হয়। মা স্কুল থেকে নিতে আসত রোজ। মা এসে বলল – দেবব্রত বিশ্বাস মারা গেছেন।

 

মাঝে মাঝে স্কুল থেকে হেঁটে আসার বায়না করতাম। আসলে, এটা-ওটা কেনার উপায় হত তা হলে। আনন্দমেলার সামনে থেকে স্পোর্টস স্টার বা স্পোর্টস ওয়র্ল্ড, বা শুকতারা – নন্টে ফন্টে – হাঁদা ভোঁদা। নিদেনপক্ষে গড়িয়াহাটের ইন্ডিয়ান সুইটস থেকে গুজিয়া বা কাজু বরফি। যদিও বেশীর ভাগ দিনই প্রতিজ্ঞা করে নিতাম যে কোনো বায়নাই করব না। সেদিনও ওরকমই কিছু একটা করে থাকব। যার ফলশ্রুতি – ওই গরম মাথায় নিয়েও হেঁটে ফার্ণ রোড থেকে শানগর রোডে ফেরা।

 

হেঁটে হেঁটে দেশপ্রিয় পার্কের কাছে এসে দেখি অনেক লোক। অনেক, মানে ঠিক কতটা ভীড় সেটা আমার মনে নেই। ধীর গতিতে একটা ডালা খোলা ম্যাটাডোর এগোচ্ছে। তাতে শুয়ে আছেন গেরুয়া-পরিহিত, সাদা দাড়িতে মুখ-ঢাকা, কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া দেবব্রত বিশ্বাস। ফুলের মালা, দীপের আলো, ধূপের ধোঁয়া…

 

প্রিয়া সিনেমার ঠিক উলটোদিকের ফুটপাথে একটা দোকানের সামনে, মানে সিঁড়িতেই, অত্যন্ত সুদর্শন এক মানুষ বসে আছেন। মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরা। মুখ রক্তবর্ণ। অত্যধিক গরমে, পথক্লান্তিতে, বা শোকে। ওই চেহারাটা আমার পরিচিত। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁকে খবরের কাগজের বাতাস দিচ্ছেন সুচিত্রা মিত্র। ম্যাটাডোরে মাথার কাছে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। মা চিনিয়ে দিল।

 

ছোটবেলায় রেডিওতেই প্রথম শুনেছি ওঁর গান। শুকতারা নিয়ে রবি ঠাকুরের কোনো একটা গান। একটুও ভালো লাগত না তখন। ভ্যাঙাতাম, বেশ মনে আছে। ওইজন্যেই শুকতারার কথাটা মনে আছে আর কি! আসলে, সবার থেকে অন্যরকম তো। ওরকম ভারী গলা। তখন নিতে পারতাম না।

 

আমার মন দিয়ে শোনা দেবব্রতর প্রথম রেকর্ড – যেটা কি না ১৯৮০ সালে বেরিয়েছিল – বোধ করি ওই নিজের লেখায়-সুরে গানগুলোর। ‘ক্যারে হ্যারায় আমারে গাইতায় দিলা না’, ‘চান-সুরুজ-গ্রহতারা ভরা আসমান’ ইত্যাদি। ওঁরই একটা সাক্ষাৎকারে পরে শুনেছি – উনি বলেছিলেন গানের কথা রবিঠাকুরের থেকে ধার করা, আর সুর প্রচলিত লোকগান থেকে।

 

এই গান শোনার অনেকদিন পরে, একদিন ‘কোমল গান্ধার’ দেখতে বসেছি। হঠাৎ শুনি ওই সুর – সুরে আছেন সুলেমান, সুরে আসমান / ওই নাম জপো বান্দা আল্লাহ তালার / ও আল্লাহ, লাইলাহাইল্লালা তুর নাম! ‘চান-সুরুজ-গ্রহতারা’! অবিকল এই সুর! ওই ফিল্মেই আরও ছিল ওঁর গান। আহা!

 

তবে ওই গান তখন মনে খুব ধরে নি মনে হয়। নইলে ওই আগস্টের দ্বিপ্রহরে ঘর্মাক্ত শববাহকের ভীড়ে কিছু মুখ দেখে মনে পড়া উচিৎ ছিল – ‘জাইন্যা হুইন্যাও কেউ কোনো রাও করে না’।

 

বাবার কাছে শুনেছি, ‘আকাশ-ভরা সূর্য-তারা’ – এই গানটা না কি ‘কোমল গান্ধার’-এর পর খুব জনপ্রিয় হয়। আর ওই – ‘অবাক পৃথিবী’? পিছনে ঠুকঠাক শব্দ হচ্ছে সেট তৈরীর। ঠিক যেন ‘হাতুড়ি ও বাটালির শব্দে মুখর এ নদীপ্রান্তর’! এর বাইরে ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ তো লেজেন্ড হয়ে গেছে!

 

যাই হোক, আমার দেবব্রত বিশ্বাসের গানের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা হল অনেক পরে। ৮৭ সালের আগে নয়। ছুটছাট দু-একটা গান – আবার এসেছে আষাঢ়, আমি চঞ্চল হে, আকাশ-ভরা ইত্যাদি – এগুলো মনে জায়গা করে নিয়েছিল তার মধ্যে। কিন্তু ৮৭ সালে একটা সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটল। ছোটমামা মার্কিন দেশে পাড়ি দেওয়ার সময় তার টেপ রেকর্ডারটা আমাদের দিয়ে গেল। সেই যে তখন শোয়ানো টেপ হত। এর আগে গান শোনা মূলত রেডিওর কল্যাণেই হচ্ছিল। আর কোনো উৎসব – অনুষ্ঠানে পাড়ার মাইকে অল্পস্বল্প।

 

ফিলিপ্স-এর ওই টেপ বাড়ীতে আসার সঙ্গে সঙ্গে যে তিনজন আমাদের – মানে আমার আর দাদার – অগ্রাধিকার পেলেন, তাঁরা হলেন – সুচিত্রা মিত্র, কিশোর কুমার এবং দেবব্রত বিশ্বাস।

 

দেবব্রত বিশ্বাসের প্রথম যে ক্যাসেটটা কিনেছিলাম তার কয়েকটা গান এখনও পর পর বলে দিতে পারব মনে হয়। আকাশভরা সূর্য তারা, বৈশাখ হে, দারুণ অগ্নিবাণে, বহু যুগের ওপার হতে… আমার বিশেষ পছন্দের ছিল – এসো গো, জ্বেলে দিও যাও… কম্পিত বক্ষের পরশ মেলে কি সজল সমীরণে… এছাড়াও – আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে… চৈত্রপবনে…

 

যখন বড়ো হয়ে উঠছি, নিজের পছন্দ-অপছন্দের একটা গতিপ্রকৃত স্পষ্ট হচ্ছে – তখন – সত্যি কথা বলতে কি – নাকে-কান্না জিনিসটা চারদিকের গানবাজনার অনেকটাই গ্রাস করে নিয়েছে। বাংলা গানের যুদ্ধ-পরবর্তী বন্ধ্যাত্ব পপুলার সংস্কৃতি ছেয়ে আছে। হিন্দী ফিল্মের গান শুনেও জুত লাগে না। বাংলা আধুনিক গান ক্রমশ অনাধুনিক হতে হতে প্রস্তরযুগের কড়া নাড়ছে। ‘সারাটি জীবন পালঙ্কে শুয়ে কাটালাম / তোরা এবার আমার মাটিতে বিছানা কর’! ভাবা যায়? বাংলা ফিল্ম মানে অমর সঙ্গী ইত্যাদি – যার কথা বেশী না-বলাই ভালো। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়। নাহ থাক! হেমন্তবাবুর আধুনিক গান যতটা ভালো লাগত (তখনও), ‘অপোরশো আঁচোলেরো’ ততটা কেন, একটুও লাগত না। সুচিত্রার প্রতি ভালোবাসা (গান ছাড়িয়েও একটা শ্রদ্ধার ভাব) অনেকটা পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। কণিকার গানের মাধুর্য বা সুবিনয়ের বৈদগ্ধ্য হৃদয়ঙ্গম করার সাধ্য হয় নি তখনও।

 

নতুনদের কথা কিই বা বলি? আশির দশকে উঠে-আসা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী – এমন কারো নাম মনেই পড়ছে না এখন, এতোটাই অবজ্ঞা দিয়েছি তাঁদের। গাইবার ভঙ্গীতে সেই চিবোনো স্বরলিপির ছিবড়ে। রবীন্দ্রনাথের থেকে তাঁর গানের স্বরলিপির মর্যাদা তখন অনেক বেড়ে গেছে।

 

ওইরকম একটা অবস্থার মধ্যে একমাত্র দেবব্রত বিশ্বাসের গানেই পেলাম আধুনিকতার সংজ্ঞা। অন্য শিল্পীদের সঙ্গে ওঁর তৈরীর একটা ফারাক ছিল। বাকীরা ছিলেন – সুচিত্রা কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম – নিছক রবিগানের শিল্পী। দেবব্রতর বেড়ে ওঠার মধ্যে রবিঠাকুরের গান ছাড়াও ছিল ময়মনসিংহের হাওয়ায় ছড়িয়ে থাকা লোকগান, আর পরবর্তীতে গণআন্দোলনের সূত্রে পাওয়া আরও নানা রকম গান আর সুর। সে-অর্থে, উনি আগমার্কা রবীন্দ্র-ইয়ে ছিলেন না আর কি!

 

সেই কারণেই হয়তো, সমস্ত চালু প্রক্রিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে রবিগানের এই ‘আঁফা তেরিবল’ (প্রতিবর্ণীকরণেও ‘টেরিবল’ হল হয়তো!) স্পষ্ট উচ্চারণে খোলা গলায় গান করছেন। স্বর থেকে স্বরান্তরে যেতে প্রথিতযশা রবিশিল্পীদের মতন ঘাই খেলাচ্ছেন না। অধিকাংশ নামীরাই এই কৌশল নিচ্ছেন কারণ স্বর ধরে রাখার দক্ষতা, অতএব স্বরপ্রত্যয়, তাঁদের নেই।

 

দেবব্রতও কি খুব সঙ্গীতকুশলী ছিলেন? সে-অর্থে হয়তো নয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে – উচ্চাঙ্গসঙ্গীত-নির্ভর রবীন্দ্রনাথের গান খুব কমই উনি গেয়েছেন। ‘বাণী তব ধায়’ – আমার ভালো লাগে না শুনে। কিন্তু ওঁর গানে একটা সততা ছিল। যে-গানে ওস্তাদি লাগে না, সেখানে দেবব্রত অবিসংবাদী রাজা!

 

অন্য প্রতিষ্ঠিতদের ঘ্যানঘ্যানে ইনিবিনি কান্নার পাশে জর্জ বিশ্বাস রাবীন্দ্রিকতার তোয়াক্কা না করে অনায়াসে গানের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে যান – ‘আর কি / কখনো / কবে / এমন সন্ধ্যা হবে’, আবার পরক্ষণে ভেঙ্গে পড়েন – ‘জনমের মতো হায় / হয়ে গেল হারা’।

 

‘আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে’ – রবিঠাকুরের অন্যতম সেরা কম্পোজিশন। দেবব্রতর কণ্ঠে শুনলে মনে হয় প্রথমে যন্ত্রসঙ্গীতের আলাপের সঙ্গে মেঘসঞ্চার… ‘কূজনহীন কাননভূমি’-র শূন্যতার ওপর মেঘ এসে ভরিয়ে দিচ্ছে তার ছায়া দিয়ে। ছায়া ঘনাইছে মনেও। ‘শ্যামল তমালবনে যে পথে সে চলে গিয়েছিল’, সেই পথেই কি ফিরে আসছে সে? নায়িকা ঘনিয়ে ওঠা মেঘের দিকে দয়িতকে কল্পনা করে তাকান – শ্যাম সে ঘনশ্যাম উমর ঘুমর আয়ো। ওই একটি মেঘপথিককে ডাক দেন – হে একা সখা, আমার ঘর, শয্যা তোমার জন্যেই তো মার্জনা করে রেখেছি। রয়েছে খোলা – কী আর্তি থাকে এই ডাকে? দেবব্রত, আমরা আপনার থেকে জেনেছি। আপনি গান শেষ করলে আমরা দেখেছি খোলা দরজার চৌকাঠে মেয়েটাকে আছাড় খেয়ে পড়তে। ‘যেও না মোরে হেলায় ফেলে’। ‘যেও না…মোরে হেলায় ফেলে’।

 

রাগমালা চিত্রের শিল্পীরা যেমন করে এঁকে দিতেন মল্লার, কানাড়া, ঠিক তেমন করে দেবব্রত আমাদের মনে এঁকে দেন গান। ‘তোমার সে উদাসীনতা সত্য কিনা জানি না সে’, ‘তখন পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল’, বা ‘স্মরণবেদনার বরণে আঁকা সে’। এ ছবি আঁকা নয় তো কি? ‘তুমি তো সেই যাবেই চ’লে’ – এই ‘যাবেই চ’লে’-র অভিঘাত অন্যদের মধ্যে সুচিত্রা মিত্রের ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে’-র সঙ্গেই মনে হয় একমাত্র তুলনীয়। ‘চেয়ে রই রাতের আকাশ-পানে / মন যে কী চায়, তা মনই জানে / আমার মনই জানে।’ একটা বন্ধ দরজার সামনে হাত ধরে নিয়ে এসে দাঁড় করান দেবব্রত। ‘বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর / কেঁপে ওঠে বন্ধ এ-ঘর’ –বাহির হতে আমাদের দুয়ারে কর হানেন। পূজার গান কখন যে মুক্তির গান হয়ে যায় ওঁর কণ্ঠে!

 

১৯৪৭-এ কণক দাশের সঙ্গে গাইলেন ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’। হয়তো নবলব্ধ স্বাধীনতার কথা মাথায় রেখেই। তবে সে-গান একটু ধীর লয়ে গাওয়া। সঙ্গে একটা ভারী ড্রামের বীট। সে-যন্ত্রকে কি বলে জানি না। হৃৎস্পন্দনের মতন পড়ছে, আর ভেতরটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। অন্যটা ছিল আরেকটু বেশী ইন্সট্রুমেন্টেশন নিয়ে। আরেকটু দ্রুত লয়ে। রেকর্ডিং-এর সাল আমার জানা নেই। তবে শুনে মনে হয় ৪৭-এর পরে কখনও। শুনলে, সত্যি কথা বলতে কি, সলিলবাবুর ওই সময়কার গানগুলো মনে পড়ে। ওই যে – ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’! মনে হয় গায়ক স্বয়ং মশাল হাতে হাঁটছেন মিছিলের সামনে। অনেকের কণ্ঠে এই গান শুনেছি। তাতে উদ্দীপনা জাগানোর চেষ্টা আছে হয়তো। আগুন জ্বালাবার অঙ্গীকার নেই। ভাবনাতে ঝড়ের হাওয়া ক্রুন করে লাগানো যায় না হে!

 

আমরা যখন একেবারে দেবব্রত-গ্রস্ত, সেই সময়ে আমার আর দাদার একটা প্রিয় খেলা ছিল। আচ্ছা, ওই গানটা, ‘ক্ষমিতে পারিলাম না যে ক্ষম হে মম দীনতা’, ওটা দেবব্রতর করে গা তো দেখি? বা ‘পাণ্ডব আমি অর্জুন গাণ্ডীবধন্বা’! আসলে, অনেক শোনার ছিল। কতটুকুই বা শোনা হল ওঁকে? কল্পনাতেও পাওয়ার কথা মনে হয় তাই। ১৯৬০-এর ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’। দেবব্রতর কণ্ঠে তখন কি যাদু ছিল সে আমাদের অজানা নয়। ১৯৬৪ সালে ওঁর গানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গেল। তারপর দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর উনি আমাদের সঙ্গে রইলেন। আমরা কী পেতে পারতাম, সেটা একবার ভাবব না?

 

দেবব্রতর খুব জনপ্রিয় গানগুলো হিন্দুস্থান রেকর্ডস থেকে বেরিয়েছে। একটা ক্যাসেট হাতে এসেছিল, যাতে ছিল আরও আগের এইচ এম ভি থেকে প্রকাশিত কিছু গান। ‘আছ আকাশ-পানে তুলে মাথা’, ‘ওগো, পথের সাথি, নমি বারম্বার’, ‘এই তো ভালো লেগেছিল’ – এইসব গান। আহা! অমন বাস ব্যারিটোন কণ্ঠ! খুব চলতে দেখিনি ওইসব গান।

 

তার বদলে নানান অদ্ভুত লেবেলে আজকাল দেবব্রতর গান দেখতে পাই বাজারে। অশক্ত শরীর, কণ্ঠ চলে না – এরকম অবস্থায় গাওয়া গান সব। শুনে কষ্ট হয়। ভালো তো লাগেই না। যাঁরা এই গানগুলো বাজারে বেচেন আর যারা কেনেন, দু-পক্ষের প্রতিই আমার তীব্র বিরাগ।

 

নিস্তরঙ্গ কালো জলে বাইন্যার নৌকা ভাসে / কালিকটের ঘাটে আর সুতানুটির বাঁকে… আমরা হলাহলেই দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। মনে হয়।

 

আমি জানতাম না গতকাল ওঁর জন্মদিন ছিল। সকালে যখন খুব বৃষ্টি পড়ছে, তখন অফিসের পথে বর্ষার গান শুনতে গিয়ে ইউটিউবে একের পর এক দেবব্রতরই গান শুনছিলাম। পরে জানলাম। মানে, জন্মদিনের কথাটা। এই কটা নিজের কথা লিখতে ইচ্ছে হল।

অজ্ঞানতিমির, গুরু, নাশ করো… টেইল এন্ডার, অথবা, নাইটওয়াচম্যানের স্বীকারোক্তি

Standard

It is far more than a game, this cricket. – Neville Cardus

উল্টোদিকে ধেয়ে আসছে বিপক্ষের ভয়ঙ্করতম আক্রমণ। চারপাশের সবুজে-মোড়া বাস্তবের মধ্যেকার যে একফালি ন্যাকড়ার মত লালচে মাটি, সেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকাটাই কাজ। একমাত্র লক্ষ্য। পড়ে থাকতে হবে। ধরে থাকতে হবে। যে-যে বিদ্যায় পারদর্শিতা – ধনুর্বিদ্যা, ভূগোল বা অ্যাকাউন্টেন্সি – সেই চেনা পরিধির ঠিক বাইরে থেকে আসবে অ্যাটাক। বিপক্ষের ভয়ঙ্করতম অ্যাটাক। দুর্বলতম পয়েন্ট লক্ষ্য করে।

অ্যামফিথিয়েটারের কোণে কোণে পোকার মতন পুঁজিয়ে থাকা মজালুটিয়ে দর্শকদের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে ধরা রইল সমর্থনের পরিমাপ। প্রান্তবাসী, যারা সাফল্যে নেচে ওঠে অশ্লীল, আর ব্যর্থতায় ভঙ্গুর বৃষ্টির মতন ঝরে যায়- তারা তাকিয়ে আছে পোষ্যের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে। লড়াইয়ে ভাগ না-নেওয়া, দুর্বল, অপ্রাসঙ্গিক আমোদগেঁড়ে – কমরেডস – পথ-চলার সাথী। তারা দলের, দেশের সমর্থক। দেশ – যে ময়দানী ক্লাব তোমার-আমার হিংসাচর্চার স্থান। নিয়ন্তার ছেড়ে-দেওয়া জন্তুর সঙ্গে লড়াইয়ে কখনও আঙ্গুল উঠবে, কখনও নামবে।

ব্যাডলাইটের পূর্বমুহূর্তে, যখন প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাহীন তবু রুদ্ধশ্বাস, চারপাশের আধখানা ঢেকে ফেলেছে কালো ছায়া – তখন হয়তো জ্ঞান গোঁসাই শ্রীরাগে ধরেছেন মহাদেব-ভজনা – যোগীশ্বর হর ভোলা মহেশ্বর / ভস্ম অঙ্গে, শিরে রঙ্গে গঙ্গাজল – গোধূলি-পরবর্তী সেই মুহুর্তকেই আক্রমণের আছড়ে পড়ার প্রকৃষ্টতম মুহুর্ত বলে চিনে নিতে হবে। যাঁরা রক্ষক হতে পারতেন, তাঁরাই পাঠালেন রক্ষণে – যাতে শেষবেলার আলোআঁধারিতে আঘাত তাঁদের না পেতে হয়। নায়কের বিমান উড়ছে, উড়বে! অনিশ্চয়তা মহানের জন্য নয়!

শাস্ত্রে বলে এক মুদ্রাক্ষেপে জয়ের সম্ভাব্যতা অর্ধেক। আর একটি জেতা-টসে হারার সম্ভাব্যতা? অসংখ্য! সুতরাং, আমাদের ব্যক্তিগত গন্তব্যগুলোকেই জিত বলে মনে হয়। পাহাড়-সমুদ্রের যুদ্ধ, ফ্লাইওভারের দেহালঙ্কার, শপিং মলের সন্ত্রাস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যার-যার অর্গ্যানিক পথে গন্তব্যে ফেরা। এইটুকুই তো…

এই আলোধোয়া ধরায় ঝড়বিধ্বস্ত বক আকছার মরিয়া থাকে। সুতরাং তুমিও বাঁচিয়া থাকিতেই পারো, মরিবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। তাহারই বীচ-বীচ মহামায়ার অসীম কৃপায় যে দু-একবার ব্যাটে-বলে হইবে, তাহাকেই সাফল্য জানিও!

কুড়ি লক্ষ বছরের ঘষামাজা করা মগজে আঁকড়ে ধরে রাখা কয়েকটা শিক্ষা, তারই নাম দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা। মহাবিশ্বের কোটি সৌরজগতের মধ্যে স্বপ্নলোকের চাবির হদিস-জানা এই যেন এক, প্রজ্ঞা! তারই কাছে হাত পাতার অভ্যাস। অথচ প্রজ্ঞা এক শৈলী ছাড়া তো কিছু নয়! এই প্রজ্ঞা দিয়েই বানিয়েছি অযুত পাঁচিল। বন্ধু, এ-যাত্রা তুমি থামাও…

প্রজ্ঞা – সফল জীবনের মন্ত্র, শিল্পের আধার। না! শক্তির উৎস, ধ্বংসের কারক। শুদ্ধির কথা আজ থেকে অন্তত অর্ধ শতাব্দী আগে শেষবার উচ্চারিত হয়েছে, মনে হয়। প্রজ্ঞার শক্তিরূপী বিকাশ যিনি জানেন, খেলার চাবিকাঠিটি তাঁরই হাতে। আক্রমণের সাফল্য মেপে নেওয়া ধ্বংসের পরিমাণে।

নিজের সৃষ্ট উপাদান দিয়ে নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করা। যাবতীয় ঠিক-ভুল, ন্যায়-অন্যায়ের হিসেব জমা হচ্ছে – ঈশ্বরের অবর্তমানে – শুধু ক্রমিক সংখ্যার ভিতর। সিস্টেমই শেষ কথা বলতে চাইছে। আলো পড়ে আসছে, মুঠি কঠিন হয়ে আসছে। নিয়মের সঙ্গে সাযুজ্য রাখার খেলায় ক্রমশই পিছু হটা।

ক্রীড়াবিদ হয়ে উঠছেন ক্রীড়নক। সভ্যতার বিবর্তনের খতিয়ান। মোর শকতি নাহি…

দিশাহীনতার নাম ভবিতব্য। অর্থাৎ, যাহা ঘটিবে।

মহা-আশঙ্কা জপিছে… তবু তারই মধ্যে কোনো এক মোহে… টিঁকে থাকার তীব্র এক মোহ আছে। না কি, ধ্বংসের মোহে ঢাকা পড়ল সব?

পুরোনো সময় চলে গিয়ে ক্রমে নতুন সময়ের জন্ম হয়। নতুন সময়ের নতুন মাপ, নতুন একক। সর্বব্যাপী ধ্বংসের ব্যাখ্যানে সৃষ্টিকে মনে হয় তাৎক্ষণিক সুখ। স্লো-মো ক্যামেরায় বারংবার আঘাত বা পরাজয়ের ছবি। জয় যেন একটা তাৎক্ষণিক অনুভূতি।

রাত পেরোলে, কাল সকালে, শিশির থাকলেও… দিনটা নতুন হবে। নতুন আক্রমণের সময় হয়েছে যেমন, তেমনই সময় হয়েছে নতুন করে তার মোকাবিলার। সবার চোখের আড়ালে তৈরী রেখেছি নতুন খেলার ছক।

নতুন নিয়ম। নতুন ব্যাকরণ।

‘ঐহিক’ খেলা যখন @ বিয়ন্ড ক্রিকেট অগাস্ট ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত

অভঙ্গ ও জনাবাঈ

Standard

অভঙ্গ জানেন তো? অভঙ্গ? আমি যেটুকু জানি তাতে অভঙ্গ হল ভিটঠল বা ভিঠোবার উদ্দেশ্যে নামসংকীর্তন। আদতে ব্যাপারটা ওই মুড়াগাছার কীর্তনের মতন, নন-স্টপ। তাই অ-ভঙ্গ। আর ভিটঠলকে ধরে নিতে পারেন কেষ্ট ঠাকুরের আরেক রূপ। তাঁর সঙ্গিনীর নাম রখুমাঈ। যদিও অনেক ঐতিহাসিকের মতে বিষ্ণু আর বুদ্ধের মিলিত রূপ হলেন ভিটঠল।

মারাঠী অভঙ্গ শুনতে আমার বেশ লাগে। মূলতঃ চমতকার তাল আর ছন্দের জন্য। কিছু কিছু কথা বুঝতে পারা যায় খুব মন দিয়ে শুনলে। ভীমসেনজীর গাওয়া গানগুলো দিয়ে আমার অভঙ্গ শোনার শুরু। পরে আরও নানান শিল্পীর কণ্ঠেও অভঙ্গ শুনেছি।

এমন ভাবেই একদিন গানসরস্বতী কিশোরী আমোনকরের কণ্ঠে একখানা গান শুনলাম। গানটির রচয়িতা – আদতে রচয়িত্রী – ‘সন্ত’ জনাবাঈ।

ত্রয়োদশ শতকের মানুষ জনা, বা জনী। মৃত্যু ১৩৫০-এ। জন্মের সময়টা ঠিক ঠিক জানা যায় না। আমাদের লালনের মতন আর কি। নিচু শ্রেণীতে জন্মে অল্প বয়েসে মা-কে হারালেন। মা-মরা মেয়েকে বাপ কাঁধে করে নিয়ে এলেন পন্ডহরপুরে, অতঃপর।

এই পন্ডহরপুর জায়গাটা এক অর্থে পুণ্যভূমি। চন্দ্রভাগা নদীর ধারে। এখানেই ভিটঠলের মন্দির গড়ে তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন পুণ্ডলীক, বা পুণ্ডরীক, যিনি ছিলেন ভিটঠলের প্রথম সেবক। এই নামে সত্যি কেউ ছিলেন কি না সে বিষয়ে অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায় না। তা না হোক, তা বলে কি পুণ্ডলীক ছিলেন না?!

তা, পন্ডহরপুরে এসে পেটের ভাত যোগাড়ের লক্ষ্যে জনাকে তাঁর বাপ লাগিয়ে দিলেন এক বাড়িতে। সেই বাড়ির মালিকের ছেলেটা জনার প্রায় সমবয়সী। তার দেখাশোনা করাই জনীর প্রধান কাজ। তার নাম? এই নামটা একটু চেনা হলেও হতে পারে। নামদেব। মারাঠী ভজনের স্টলওয়ার্ট, সেই নামদেব।

পরবর্তীতে জনী তাঁর সঙ্গীতসৃষ্টির গুণে জায়গা করে নিলেন এই নামদেবের পাশে। মারাঠী ভজনে ধ্যানেশ্বর, একনাথ, নামদেব আর তুকারামের সঙ্গেই উচ্চারিত হতে থাকল জনীর নাম। সমাজের নিচুতলার অচ্ছুৎকন্যা জনী, ওয়রকরী শ্রেণীর জনী খ্যাত হলেন সন্ত জনাবাঈ নামে।

জনীর যে গানটা শুনেছিলাম, তার কথাক’টা ছিল এইরকম –

জনী জায় পাণীয়াসী।
মাগে ধাওএঁ হৃষীকেশী।।
পায় ভিজো নেদী হাথে।
মাথা ঘাগরী ওঅহাত।।
পাণী রাজণাত ভরী।
সড়া সারওঅণ করী।।
ধুণে ধুওনিয়া আণী।
হ্মণে নাময়াচী জনী।।

বাংলায় ব্যাপারটা কিছুটা এইরকম দাঁড়ায় –

জল ভরিতে যায় জনী।
হৃষীকেশ ধায়েন পিছনি।।
পায়ে না দেন জল ছোঁয়াতে।
কলসি নেন নিজ মাথে।।
পাত্রে ভরেন জল, আরও।
উঠানে বুলান ঝাড়ু।।
ধোন বস্ত্র যত আনি।
ভনে নামদেবের জনী।।

গানটা শুনলে আমার কেমন মনে হয়, হৃষীকেশ বা ভিটঠল আর নামদেবে ভেদ নেই কোনো – জনীর কাছে।

আর দু-একটা ছোট কথা। ১৯৪৭ সনে পাণ্ডুরং সদাশিভ সাণে নামক এক গান্ধীবাদী নেতা – মানে ‘জাতীয় শিক্ষক’ সাণে – ওয়রকরী ও অন্যান্য জাতের অচ্ছুৎদের ভিটঠল মন্দিরে প্রবেশের দাবীতে অনশন শুরু করেন, এবং এগারো দিনের অনশনের পর যুদ্ধে জেতেন। মন্দিরের দরজা খুলে যায় সকলের জন্য। আর ২০১৪ সালের মে মাসে সারা দেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এই মন্দির সমস্ত নীচু জাতির মানুষ ও নারীদের পৌরোহিত্য করবার অনুমতি দেয়।

গানটাও শুনে নিন এই ফাঁকে।

জনী জায় পাণীয়াসী – কিশোরী আমোনকর

গানের ছবি, ছবির গান

Standard

এক-একটা গানের সঙ্গে এক-একটা ছবি জড়িয়ে থাকে। সঙ্গীত বিমূর্ততার শ্রেষ্ঠ রূপ! আমায় নিয়ে যাবি কে রে দিনশেষের শেষ খেয়ায়… ওরে আয়… হেমন্তবাবুর গান আমি তেমন ভালোবাসি না… তাও এই কন্ঠভাসানোটা… পদ্ম যেমন ভাসে গঙ্গার জলে…

পুজো-আচ্চার রোজগারে একটা দোতলা বাড়ি বানিয়েছিল এক সাধারণ মানুষ যার পেডিগ্রী বলতে যা বোঝায় সেসবের বালাই ছিল না। বংশগৌরব বলতে – ফরিদপুর কোটালিপাড়ার সিদ্ধান্তবাড়ির ছেলে সে। সে বংশগৌরবের মৃত্যু হয়েছে সাঁইত্রিশে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় আসায় সময়েই। পাঁচ ভাই বড়ো হলে তাদের ভরন্ত সংসার সামাল দেওয়ার জন্য সেই দোতলাকেই জোর করে তিনতলা বানানো হল একটা লোহার পাকানো সিঁড়ি এঁটে। সেই সিঁড়ির ছাদ-লাগোয়া ল্যান্ডিঙে বসে চিৎকার করে গান করছে একটা ছেলে। ডাকলে আমি ক্ষণেক থামি হেথায় পাড়ি দূর দেশে … ভুলভাল কথায়… তবু… সে-ছেলে গান গাইতে জানে না। শুধু শুনতে জানে। রেডিওতে-এখানে-ওখানে। এই ছেলেটা ওই লোকটার নাতি। মৃত্যুর পর পার হয়েছে চল্লিশ বছর।

ল্যান্ডিঙে বসলে সামনে বস্তি পেরিয়ে বেশ কিছুটা চোখ গেলে তবেই বড়ো বাড়ি। সে-ও অনেকটা দূর। পঞ্চানন না কি শেষ বয়স অবধি খালি চোখেও বহুদূর দেখতে পেতেন। ওই বড়ো বাড়ি্টার গায়ে শ্যাওলা জমেছে। আর একটু মাথা তুললেই বাঁদিকের পাগলাবাড়ির কুন্তুদা-র ঘর থেকে ডানদিকের টুয়াদের ঘর পর্যন্ত পুরোটা আকাশ। বিশ্বকর্মা পুজোর সময় ঘুড়ি, আর সারা বছর রঙিন মেঘে ভর্তি আকাশ। শ্যাওলাবাড়ির ওইদিকে কালবৈশাখীর মেঘ জমে। ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানের পতাকা আর লঝঝড়ে অ্যান্টেনা। এই ছেলেটা আর ওর দাদা – দুই ভাই দুই দলের সাপোর্টার। কেউ সাবির আলিকে ঠুকে ছড়া লিখছে, তো কেউ মানস ভটচাজকে। একটা মোটা জাবেদা খাতায় এখনকার ভাষায় কুৎসা। ছবি আর ছড়ার খাতা। কে দিয়েছিল ? বাট্টোদাদা ? হঠাত করে মরে গেল ঘুমের ওষুধ খেয়ে। একটা পয়লা বৈশাখে বাট্টোদাদা চলে যাওয়ার পর নতুন জামা (জামা বা স্যান্ডো গেঞ্জি) পরা হয় না আর। মা-বাবার একটু সুবিধেই হল বোধ হয়।

বাট্টোদাদা থাকতে পিচবোর্ডের তলোয়ার আর তুঁতে-দেওয়া আঠার কথা ভাবতে হত না। ওদের প্রেস ছিল। বাট্টোদাদার মেয়ে টুয়া খুব বন্ধু , খেলার সাথী। সেই প্রেসের পাশ দিয়ে গলি, আর সেই গলি দিয়ে চার-পাঁচটা রাজহাঁস খেলার সময় সোজা উঠোনে। গুহবাড়ির হাঁস। গুহরা খুব বড়োলোক! এলাহি কালীপুজো করে। ফুটো-ফুটো বোর্ড লাগানো সিলিং ওদের ঘরে! নড়েভোলা বলদা ডুগীও ওই বাড়িরই। ‘ ব্যার্লন ’-শৈশবের শেষে পাজামা-কৈশোর। মা যে কতো কিছু বানাতে পারে!

ওই ল্যান্ডিঙের পাশে একটা ঘর। পীযূষদা এলেন একদিন। একটা সিড়িঙ্গে লম্বা লোক , ফানি গোলাপী চশমা। ছোট্ট, গোল – ঠিক ওঁর বিপরীত। কিন্তু গলার আওয়াজ শুনলে মনে হয় দূরে কোথাও মেঘ ডাকে। বদ্দাদার পরিচিত পীযূষদা। কাছের ইস্কুলের ইংরিজির মাস্টারমশাই পীযূষদা। পাশে বাড়ির থেকে হারমোনিয়াম হাজির। একদিন যারা মেরেছিলো তারে গিয়ে… যিশুকে নিয়ে গান আগে শুনিনি কখনও। সকলে বুঝিয়ে দেয় মানবপুত্র কে। উড়ে-মেড়োতে বদ্দাদার মেয়ে। ও কিসব যিসাস দ্য লর্ড সেইড-ফেইড… পোষায় না।

প্রতি সন্ধ্যেয় লোডশেডিং বাঁধা! ল্যাবযন্ত্রের মতন ল্যাম্প – যার তলায় ছলছল কেরোসিন। কি সুন্দর দেখতে! ঘরের একশো পাওয়ারের বাল্বের থেকে একটু কম আলো। একটু কাঁপে। কিন্তু দেখতে ভারী ভালো লাগে। কাচটার থেকে সাবধান! হাত লাগলেই চামড়া কুঁচকে যায় এতো গরম!

ঘরটাও অদ্ভুত। একটা ঘরের দুটো ভাগ। মাঝে দরজা নেই কোনো। দুপুরের গরমটুকু কাটাতে পারলে ঠাণ্ডা হাওয়ার অভাব নেই। কিছুরই অভাব নেই। মায়ের রান্না করতে করতে ‘ পশ্চিমবঙ্গ ’ মুখস্থ করানো। পড়াশোনা শেষ হলে ছোটজ্যাঠার ভরাট ব্যারিটোন গলার গান। নিরেট অন্ধকারে যখন বড়ো বাড়ি আর বস্তি এক হয়ে যায় , তখন ছোটজ্যাঠার গান জলের মতন ছড়িয়ে যায় অন্ধকারে। শব্দও কি জলের মতন জায়গা খোঁজে না ? ‘ও আলোর পথযাত্রী , এ যে রাত্রি! এখানে থেমো না! ’ দাদু-দিদা বলত মেয়েটার বড়ো কষ্ট।

খুব জ্বরে বিছানায় শুয়ে একবার অ্যাসবেস্টসের চালের চুনকাম আর আলকাতরা-লেগে-থাকা স্ক্রুয়ের ব্যাকগ্রাউন্ডে মায়ের মুখ। মন্দাকিনীর ধারা , উষার শুকতারা , / কনকচাঁপা কানে কানে যে সুর পেল শিক্ষা … মায়ের খুব গান শেখার শখ ছিল কিন্তু হয় নি। খুব একটা ভালো গলা না হয়তো, কিন্তু আমি কাকেই বা আর গাইতে বলি!

দাদু বড়োমানুষের ছেলে। বুড়োদাদু পণ্ডিত আর বড়োলোক। সদানন্দ রোডে বিশাল তিনতলা বাড়ি। ছাদের স্টেইনড গ্লাসের ঠাকুরঘর রাস্তা থেকে দেখা যায়। স্কুল থেকে ফেরার পথে ২ বা ২বি-তে রাসবিহারীর বদলে মাঝে মাঝে কালীঘাট। মায়ের ভাবনা ছেলেদের খাওয়াদাওয়া ঠিকমতন হচ্ছে না। মাঝে মাঝে তাই মামাবাড়ির ভালোমন্দ। দিদার রান্না! ছোলার ডাল , বেগুনভাজা , কখনও বোয়াল বা শোল! লিলিপুল হয়ে হ্যাঙ্গিং ব্রিজ থেকে বাবার সঙ্গে শোল মাছ দেখা। আর আরও একটু আগে মাছেদের নিয়ে বানানো রূপকথা শোনা। মা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত গল্প বলতে বলতে।

পুজোয় মামাবাড়ি মাস্ট! ডানদিকে সবুজ সংঘ , বাঁদিকে মহাশক্তি আর সামনে কিছুটা এগোলে ডিফেন্স ইউনিট। হিন্দী গান বাড়িতে খুব চলে না। নিষেধ নেই , প্রশ্রয়ও নেই। পুজোর সময় মামাবাড়ির বারান্দায় দাঁড়ালে দিল খুশ। তিনদিক থেকে গান। ইয়াম্মা ইয়াম্মা , ডিস্কো ড্যান্সার , দিলবর মেরে কবতক মুঝে, ওম শান্তি ওম…

তুমি আমাদের পিতা / তোমায় পিতা বলে যেন জানি / তোমায় নত হয়ে যেন মানি / তুমি কোরো না কোরো না রোষ… বুড়োদাদু মারা গেলে মামাবাড়িতে রাজসূয় যজ্ঞ! গান-টান হল অনেকদিন ধরে। সংকীর্তনের মতন। শ্রাদ্ধের সময় পণ্ডিতদের মধ্যে সংস্কৃতে ঝগড়াও হয়ে গেল! সকলে বেজায় শ্রদ্ধাবনত। আমি কাঁচা মুগডাল খেয়ে বমি করে ফেললাম। বুড়োদাদু পালী আর সংস্কৃতে পণ্ডিত ছিল।

ছোদ্দাদা লেখাপড়া শেখেনি বিশেষ , কিন্তু খুবই করিৎকর্মা। ঠাকুর বানানো , ঝুলনে সাজানো , এটাসেটা সারানো… একেবারে এক্সপার্ট। মেজজ্যাঠার ইজিচেয়ার দিয়ে যা একটা দোলনা! তাতে রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি। একটা রেকর্ড প্লেয়ারই বানিয়ে ফেললো। আআমাআআআর সপ্নো যে সোত্তি হল আআআজ… উঠো উঠো সুরজাই রে… শেই লওকটা আমী ছিলম কালিয়া… অনুসন্ধান আর ‘খেলা ফুটবল খেলা ’ জমিয়ে শোনা। নাজিয়া জোহেব হাসানের ডিস্কো দিওয়ানে আর বুম বুম। স্পিড কমে গেলে আস্তে গাও, আর ঠিক থাকলে তো কথাই নেই! অনেক দিন পরে ইউনিভার্সিটির ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়ে গোপালপুরের সী শেলসে মনে পড়ে গেল। গোপালপুরে ছাড়া গরুদের পেটপুরে মদ্যসেবন।

সামনের ঘরের সিলিংটা ভেঙ্গে পড়েছে উইয়ে। লোহার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে আর ওঠা যায় না। ভেঙ্গে পড়তে পারে না কি যখন-তখন! সেই ছাদটাতে যাওয়া যায় না আর! এ ঘর ছেড়েছি আজ প্রায় কুড়ি বছর হতে চলল। প্রেস বন্ধ। যে গলি দিয়ে হাঁসগুলো ঢুকতো , সেখান থেকে আরেকটু এগোলে মস্ত বড়ো একটা কলাগাছ হয়ে গেছে বাড়ির মধ্যে। জ্যাঠারা কেউই নেই। শুধু পঞ্চানন ভ্রুকুটি করে এখনও তাকিয়ে আছেন দেওয়াল থেকে। যে-দৃষ্টিতে বৃদ্ধ বহুদূর থেকে আপন-পর চিনে নিতেন, সেই চোখে দেখছেন তাঁর সাধের ‘রঙ্গিলা দলানের মাটি ’ ভেঙ্গে পড়ছে দ্রুত। সন্ততিরা ভিটেটা প্রমোটারদের হাতে তুলে দিয়ে নিষ্কৃতি চাইছে সকলেই। নামিয়ে মুখ চুকিয়ে সুখ যাবার মুখে যায় যারা / ফেরার পথে ফিরেও নাহি চায় … ওরে আয় , আমায় নিয়ে যাবি কে রে বেলাশেষের শেষ খেয়ায়…

রবিঠাকুর ও চুরি!

Standard

Untitled

গতকাল মা-দিবস গেল। সঙ্গে রবিঠাকুরের জন্মদিন।

মা আর রবীন্দ্রনাথ – এই দুজনকে নিয়ে লেখাই বেশ চাপের। সমস্যা হল – মা খুবই বেশী করে আমার কাছের (সবারই)। এতোটাই যে তাকে আলাদা করে আর দেখা হয়ে উঠলো না। আর রবীন্দ্রনাথ আমার কোনোদিনই হন নি। ফলে ‘আমার মা’ বা ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ – এ-ধরণের কিছু লেখা আমার পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু কিছু না লিখলে মান থাকে না, তাই …

মায়ের ব্যাপার ছেড়ে রবীন্দ্রনাথে আসি, কারণ উনি আমার মায়ের থেকে অনেক বেশী নাম করেছিলেন বলে আপনারা সবাই তাঁকে চেনেন।

ওঁর লেখা গুটিকয় ছোটগল্প আর কবিতা আমি পড়েছি। ওঁর লেখা আর সুর করা কিছু গান শুনেছি। তবে তা দিয়ে কাজ চলা মুশকিল – আমি মানছি। ফলে, আমার অন্যান্য মৌলিক লেখার মতন এই লেখাটাও নেট-টোকাটুকি করে নামাচ্ছি। আশা করি অন্যান্যবারের মত এবারও আপনাদের সমাদর থেকে বঞ্চিত হব না।

রবীন্দ্রনাথ ও তৎকালীন হেয়ারকাট, রবীন্দ্রনাথ ও রাত, বা পথ, বা জার্মানি, বা শ্বশুরবাড়ি জাতীয় সুচিন্তিত এবং গবেষণা-গম্ভীর লেখা আপনারা যাঁরা প্রকৃত রবীন্দ্রপ্রেমী তাঁরা অনেকেই পড়েছেন। বইমেলায় রবি-ব্যাভিচার-বিশেষজ্ঞ এক নামজাদা লেখককে দেখে পরিচিত কবি শুভাশিস ভাদুড়ি দৌড়ে সামনে গিয়ে হাতের কাছে পেয়ে যাওয়া একটা খবরের কাগজ তুলে চিৎকার করেছিলেন – ‘রবীন্দ্রনাথ ও আমবাত’! ‘রবীন্দ্রনাথ ও আমবাত’! ‘রবীন্দ্রনাথ ও আমবাত’! তবে ‘রবীন্দ্রনাথ ও চুরি’ – এই বিষয়ে আমার এই রচনাই প্রথম, সুতরাং মৌলিক!

টোকাটুকিও এক ধরণের চুরি। তবে এই চুরি করলে দাতার কোনো ক্ষতিসাধন হয় না। তাই এই চুরি অতটা খারাপ নয় যতটা, হে বিদুষী পাঠিকা, আপনি ভাবছেন। আমি আপনার কৃপাদৃষ্টি ভিক্ষা করি!

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে চুরির সম্পর্ককে অঙ্গাঙ্গী বললে খুব একটা অত্যুক্তি করা হয় না বোধ হয়। নলিনীকান্ত সরকারের বইতে পড়েছি, মোহিতলাল মজুমদার কোনও এক বৈঠকে রবিঠাকুরের কোনও কোনও রচনাকে পরস্বাপহরণ বলে দোষ দিচ্ছিলেন। দেখেশুনে শান্ত থাকতে না-পেরে ওই বৈঠকে উপস্থিত নলিনী বলেন যে মোহিতলালের অধিকাংশ রচনাও তবে গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা থেকে চুরি, কারণ ওঁর কবিতায় বসন্ত, গ্রীষ্ম ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার রয়েছে! বাউলাগানের সর্বজনস্বীকৃত পণ্ডিত সুধীরবাবুর বইতে পড়েছি, পুণ্যভূমি ছেঁউড়ের কিছু বাউল সাধক না কি অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন – লালন সাঁইয়ের গান চুরি করে রবিঠাকুর নোবেল পেয়েছিলেন!

রবিঠাকুরের সঙ্গে চুরির সর্বশেষ মোলাকাত ঘটে তাঁর নিজেরই নোবেল পদকের বদান্যতায়। তবে সে অনেক বড়ো মানুষদের কথা! ও-সব কোনো গোলাপী শার্দূলের জন্য তোলা থাক!

ঘটনাটা ১৯২৪ সালের। রবিঠাকুর বেশ কিছুদিন হল নোবেল পেয়েছেন। বিশ্বজোড়া নাম তাঁর। তবে তারই মধ্যে তিনি বিশেষভাবে জনপ্রিয় লাতিন আমেরিকায়। পেরু সরকারের আমন্ত্রণে ওই বছর তিনি যাচ্ছেন তাঁদের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। পথে, বুয়েনোস আয়ার্স-এ অসুস্থতা এবং ওকাম্পোর সঙ্গে মোলাকাত।
ততদিনে লাতিন আমেরিকার বিদ্বজ্জনের কাছে রবিঠাকুর পরিচিত নাম। ১৯১৩-তে নোবেলজয়ের পরেই ‘প্লাতেরো ই ইয়ো’, বা ‘প্লাতেরো ও আমি’-খ্যাত হুয়ান রামোন হিমেইনেস ও তাঁর মার্কিনি বান্ধবী জেনোবিয়া গীতাঞ্জলী-র অনুবাদ করতে শুরু করেন। এই বই পরবর্তীকালে ‘১৯২৭-এর প্রজন্ম’-কে (যার কয়েকজন নক্ষত্র ছিলেন রাফায়েল আলবেরতি, ভিসেন্তে অ্যালেইকসান্দ্রে আর – ফেদেরিকো গার্থিয়া লরকা), খুব প্রভাবিত করে। ১৯২১-এ স্পেনযাত্রার কথা ছিল রবিঠাকুরের। বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে লরকা ‘বিসর্জন’ নাটকে অভিনয় করা মনস্থ করেন। জয়সিংহের ভূমিকায় লরকা স্বয়ং! কিন্তু সে-যাত্রা শেষপর্যন্ত বাতিল হয়।

ইতোমধ্যে হিমেইনেস-এর অনুবাদের সূত্রে রবিঠাকুরের নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে। চিলিতেও। ১৯৪৫-এর নোবেলজয়ী চিলির গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল রবিঠাকুরের কবিতার সংকলন বের করলেন।

শুধু মিস্ত্রালেরই নয়, চিলির আরও একজন কবির – নামটা তাঁর পরেই বলছি – মাথাও ঘুরে যায় এইরকম সময়ে। কবিজন্মের প্রারম্ভ তখন তাঁর।

১৯২৪-এ তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয় – যার ইংরাজী নাম “Twenty Love Poems and a Desperate Song” ।

১৯৩৪ সালে আর্জেন্তিনার প্রো নামের একটি সাহিত্য পত্রিকায় এই বইয়ের ষোলো নম্বর কবিতা নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। কবিতাটা না কি রবিঠাকুরের একটা কবিতার থেকে টোকা! রবিঠাকুরের ‘দ্য গার্ডনার’ বইয়ের ৩০ নম্বর কবিতা – যা নাকি স্প্যানিশে অনুবাদ করেন হিমেইনেস-এর জেনোবিয়া, আর ওই কবির এই কবিতা – এ-দুটো পাশাপাশি ছাপিয়ে এই দাবী করেন ভোলোদিয়া টাইটেলবয়েম।

কেমন ছিল রবিঠাকুরের সেই কবিতা?

You are the evening cloud floating in the sky of my dreams.
I paint you and fashion you ever with my love longings.
You are my own, my own, Dweller in my endless dreams!
Your feet are rosy-red with the glow of my heart’s desire, Gleaner of my sunset songs!
Your lips are bitter-sweet with the taste of my wine of pain.
You are my own, my own, Dweller in my lonesome dreams!…

তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা…

আর সেই সদ্য-কবি লিখেছিলেন –

Eres mía, eres mía, mujer de labios dulces
y viven en tu vida mis infinitos sueños.

মানে – You are mine, you are mine of sweet lips and my infinite dreams live in your life (জেসন উইলসনের বইতে যা আছে)।

ঠাকুরের অনুবাদের জেনোবিয়া লিখেছিলেন –

Eres mía, eres mía, y vives en mis suenos solitarios

মানে – You are mine, you are mine and live in my solitary dreams (সূত্র – ঐ)।

পাওলো দে রোখা, ভিসেন্ত ইদোব্রো-র মতন কবিরা এই নিয়ে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রোখা তো ওই কবিকে একেবারে চোর বলে দেগে দেন, আর বলেন ওঁর সব লেখাই প্রায় চুরি – কখনও টেগোর, তো কখনও বদলেয়ার, রাঁবো, এরকাস্তি! অশান্তি এতোদূর যায় যে ১৯৩৭-এ নতুন সংস্করণ বেরোনোর সময় ওই কবি এই ষোলো নম্বর কবিতার নিচে লিখে দেন – “Paráfrasis a R. Tagore”! অর্থাৎ, ব্যাপারটা টেগোরের কবিতার paraphrase ।

ওই কবির নাম পাউলো নেরুদা! ১৯৭১-এর নোবেলজয়ী কবি।

এতো সব পড়ে আপনাদের কি মনে হবে আমি কি জানি? আমার কাছে নেরুদা স্বমহিমাতেই আছেন!

থাকবেনও!