আমাদের ভালো পুজো

Standard

লেখাপড়া তেমন বেশী শিখি নি বলে আমাদের ইশকুলে ছুটি হত খুব। হয়ত খুব ছুটি হত তাই শিখি নি। কে জানে!

আমাদের পুজোর ছুটি শুরু হত মহালয়া থেকে। একেবারে ভাইফোঁটা পর্যন্ত। নিরবচ্ছিন্ন ছুটি।

মহালয়ার দিন কাকভোরে মা ঘুম থেকে তুলে দিত। মানে দেওয়ার চেষ্টা করত আর কী। হুড়মুড়িয়ে বিবর্ণ সাদা মশারির জড়ামড়ি ছেড়ে রেডিওর সামনে প্রথমে বসা। তারপর আধশোয়া। তারপর ঢুলুনি। তখন টিভি ছিল না। মহালয়ার দিন থেকেই যেন সব কেমন ঝলমলে, সুন্দর। যুবক সমিতির প্যান্ডেল প্রায় শেষের পথে – দেখতাম জানলা থেকে। বাবার ভক্তিশ্রদ্ধা ছিল না তেমন কোনোকালেই। জ্যাঠারা কাছের টালিনালার ঘোলা জলে পিতৃতর্পণ সেরে ফিরত। তারপর ছোট উঠোনে বসত আড্ডা। সেখানে আমি, দাদা, আমার বাকী সব জ্যাঠতুতো দাদা-দিদিরা। উৎসবের শুরু।

তবু আমার পুজো মানে মামাবাড়িই। দাদু এসে আমার বড়ো জ্যাঠা-জ্যেঠিমার থেকে মায়ের পিতৃগৃহে যাবার অনুমতি নিয়ে যেত, মনে আছে। আমার পিতামহ গত হয়েছেন আমার বাবার ছোটবেলায়। দিম্মা মারা গেছে তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। আমার দেখা প্রথম মৃত্যু। ঠাকুমা দীর্ঘজীবী ও চলচ্ছক্তিহীন হয়েছিলেন, মনে পড়ে।

মামাবাড়িতে পুজো হত। একচালার ঠাকুর আসত পটুয়াপাড়া থেকে। চালকুমড়ো বলি হত। মেজদাদু– দাদুর মেজভাই – রোগা শরীরে বিরাট দস্যুসুলভ অঙ্গভঙ্গি করে সেই বলি দিত – একটা বিশাল খাঁড়া দিয়ে। তবে, দশমীর দিন একশো আটবার দুর্গানাম লেখার পর সেই খাঁড়ায় পেন্নাম দিতে হত। তখন বেশ একটা সমীহের ভাব জাগত মনে। বিসর্জনের পর ঠাকুরের অস্ত্র নিয়ে কাড়াকাড়ি হত একটা। তাতে আমিও থাকতাম। তবে আমি অস্ত্রলোভী ছিলাম বলেই হয় ত মা দুর্গা পুণ্যলোভীদের প্রতিবারই জিতিয়ে দিতেন। আমার ভাগ্যে চিরকাল ছোটখাট কিছু একটা জুটত। ওই চক্রজাতীয় কিছু।

মামাবাড়ির উঠোনে পাম্পঘরের দরজার কাছে ছিল একটা শিউলি গাছ। আর সেই গাছে ছিল ঝাঁক-ঝাঁক শুঁয়োপোকা। সেই থেকে শিউলির কথা উঠলেই, আর কাঞ্চনগাছের (ওটা ছিল আমাদের বাড়িতে), আমার আগে শুঁয়োপোকার কথাই মনে হয়।

একেবারে ছোট ছিলাম যখন, তখন একা থাকা হত না। মানে মামাবাড়িতে। তাই ষষ্ঠী থেকে দাদা বডি ফেললেও আমি যেতাম সপ্তমীর দিন। মায়ের হাত ধরে। একবার টানা রিকশা থেকে পড়ে গেছিলাম বলে হেঁটেই যেতে হবে। ভয়টা মায়ের ছিল। আমার নয়। মা এখনও ভয় পায় অবশ্য। আমাকে, দাদাকে নিয়ে। সে সব নানান অমূলক ভয়।

মামাবাড়ি আমার ছিল সে-কালের বড়োলোকের বাড়ি। দাদুর বাবা, আমার প্রমাতামহ ডক্টর অমরেশ্বর ঠাকুর ছিলেন বংশানুক্রমে শ্রীচৈতন্যের মাতুলবংশীয়, আর পালি আর সংস্কৃতের ডবল এম এ, পণ্ডিত মানুষ। বুড়োদাদুর স্মৃতি আমার খুব তাজা নয়। আমার বছর ছয়-সাত বয়েসে তিনি চক্ষু মোদেন। কিন্তু স্মৃতি যেটুকু আছে, তাতে মনে পড়ে – উনি আদর করে কেন যেন আমায় ‘বাইঞ্চত’ বলে ডাকতেন। তখন খুবই ছোট ছিলাম বলে এই স্নেহের ডাকের মর্ম বুঝি নি। যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ চেয়ার প্রোফেসর ডক্টর অমরেশ্বর ঠাকুর সে-কালে বড়োলোকই ছিলেন। তিনতলা বাড়ি বানিয়েছিলেন কালীঘাটের সদানন্দ রোডে।

তা সেই ডক্টর অমরেশ্বরের বড়ো ছেলে রবীন্দ্রনাথ – হ্যাঁ, ঠাকুরই – আমার মায়ের বাবা। আট সন্তানের জনক – যার দু’জন শৈশব ও কৈশোরে মৃত। জীবিতদের মধ্যে বড়োমামা ততদিনে অ্যামেরিকাপ্রবাসী। মেসোর কাজের সুবাদে ছোটমাসী দিল্লীবাসিনী। ছোটমামা পড়াশোনা করছে ফলে প্রায় বেকার। আর মাসীরা আর আমার মাসতুতো দাদারা। পুজো মানে মামাবাড়িতে গিয়ে এই মাসতুতো দাদাদের সকলের সঙ্গে দেখা হওয়া। আর ছোটমামার সঙ্গে ঘুরঘুর।

তখন টেস্ট ক্রিকেট চলত ওই সময়। বিদেশের কোনও দল ভারতে আসত, আর ওই সময়ের খেলাটা হত ইডেনে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে মায়ের হাত ধরে মামাবাড়ি যাবার পথে প্রচুর ফড়িং-এর ওড়াউড়ি দেখতাম। আর মামাবাড়ির ভারত টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ – যতক্ষণ ভালো লাগে ততক্ষণ। টিভিতেও বুঝতাম – ইডেনভর্তি ফড়িং। সে খেলার থেকে উঠলে নিজেদের খেলা। নীচের উঠোনে ক্রিকেট। আর আপেল বেলুন কিনে সেই দিয়ে ঘরে হ্যান্ড ক্রিকেট। ওয়ান-ড্রপ আউট ছিল! সে এক সাংঘাতিক আকর্ষণের ব্যাপার।

যাবার পথে ডানদিকে সাতাশ পল্লীর পুজো যেখানে আমার বড়োজ্যাঠা পুরোহিত। বড়োজ্যাঠাই শিখিয়েছিল – দুর্গাঠাকুরের গায়ের রঙ হবে অতসী ফুলের মতন। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখে বেড়াতাম যখন – তখন চোখটা সেদিকেও থাকত। নাহ, এ যেন একটু বেশী গোলাপী, বা একটু বেশী সাদাটে – এইসব স্বগত-মন্তব্য করতাম। জ্যাঠা নিজে বেশীদূর পড়াশোনা করতে পারে নি। কিন্তু জ্যাঠার সঙ্গে কথা বলতে এলে কেউই সেটা বুঝতে পারত না।

সাতাশ পল্লী ফেলে সামনে রেণুকা রায়ের বাড়ি ছেড়ে বাঁদিকে ঘুরলে ডাক্তার জ্যেঠুর চেম্বার ফেলে, সুরেনদার টেলারিং-এর দোকান পার করে, অন্ধ্র ইশকুল (বলতাম অন্ধস্কুল) ছাড়িয়ে চৈতন্য রিসার্চ ইন্সটিট্যুট। রাস্তা পেরিয়ে বচ্চন সিং-এর ধাবা। তারপর ডিউক-পিনাকীর পিনাকীর বাড়ি। সেখানে দেখি ফিয়াট গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সুভাষ ভৌমিক। চোখে কালো চশমা। রাজপুত্তুরের মতন চেহারা তখন।

উল্টোদিকে বরুণদার ব্যায়ামাগার – মন্দ লোকে যাকে বলত নেশাভাঙের আখড়া। ছাড়িয়েই ঘোষাল ডাক্তারের চেম্বার। আমাদের শৈশবের বিভীষিকা ছিলেন ডাক্তারবাবু! তারপরেই দিলীপ স্মৃতি সংঘ – যার সদস্যেরা সকলেই মূক ও বধির। ওইটাই প্রথম ডাকের সাজের ঠাকুর হিসেবে চোখে পড়ত। দিলীপ স্মৃতি পেরিয়ে, তপন থিয়েটারের নহবতের আর্ট ডিজাইন দেখতে দেখতে আর খরখরে দেওয়ালে হাত দিয়েই মায়ের ধমক খেয়ে সিধে রাস্তায় চলতে চলতে, বাঁদিকের মহাশক্তির পুজোর প্যান্ডেলে উঁকি মারতে মারতে পৌঁছে যেতাম মামাবাড়ি।

তবে, পুজোর আসলি মজা শুরু হত দিনের আলো নিবলে।

মামাবাড়ির দোতলার বারান্দার নীচে আরও একটা ছোট বারান্দা ছিল। বারান্দা মানে, সেটা নীচের একটা ছোট ঘরের ছাদ। সন্ধ্যে হলেই বেঞ্চ পেতে সেইখানে বসে পুজো দেখা। আমি, দাদা আর ছোটমামা – আমাদের আসন বাঁধা। শ্যামাপোকার প্রবল অত্যাচার সয়েও সেইখানে বসে একদিকে শুনছি সারি সারি মানুষের কথাবার্তাহুল্লোড়। একদিক থেকে ভেসে আসছে কাচের কোল্ড ড্রিঙ্ক বোতলের গায়ে ওপেনার ঘষার রিনরিন শব্দ। আর শুনছি ডিফেন্স ইউনিটে ‘চোখের জলের হয় না কোনও রঙ’, সবুজ সংঘে ‘পেয়ার করনেওয়ালে পেয়ার করতে হ্যায় শান সে’। বাঙালি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্বন্ধে ততদিনে অবহিত হলেও সেই ঐতিহ্য যে রবীন্দ্রনাথ-কেন্দ্রিক সেই বোধ তার তখনও হয় নি। ফলে অনায়াসে ‘আপ জ্যায়সা কোই মেরে জিন্দগী মেঁ আয়ে’ আর ‘অবাক পৃথিবী’ তখন কানে আসত একইসঙ্গে।

ওই বারান্দায় বসে বসে অবাক হয়ে দেখতাম, মুখে একটা বিড়ি ঠুসে নানারঙের চক দিয়ে রাস্তায় কালীঠাকুরের ছবি আঁকছেন আদুড় গায়ে এক শিল্পী। বিস্ময়ের শেষ থাকত না।

নীচে মামাবাড়ির মূল গেটের সামনেও একটা জমায়েত বসত। তাদের অবস্থা ভালো ছিল তো বটেই, সে নিয়ে গর্বও ছিল খুব। আমাদের আত্মীয় হলেও কিভাবে বুঝে গেছিলাম – আমরা ওখানে বসলে তারা পছন্দ করত না।

ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা তো ছিলই। সকালের পলিয়েস্টার জামায় ঘামের গন্ধ তাড়াতে মেলে রাখা হয়েছে দড়িতে। সেই দড়ির থেকে টান মেরে সেই জামা পেড়ে সন্ধ্যেয় আবার বেরোনো। সঙ্গে ব্যানলনের প্যান্ট। ছোট হয়ে গেলেও সহজে ছিঁড়ত না বলে আমাদের অস্বচ্ছল পরিবারে তার কদর ছিল।

তখন ওই অঞ্চলের ঠাকুরের মধ্যে বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল সংঘশ্রী-র ঠাকুরের। চিরাচরিত দুর্গামূর্তি ছেড়ে ওরা করত নতুন নতুন মডেলের প্রতিমা। তার মধ্যে অম্বা-অম্বিকা-অম্বালিকা সংক্রান্ত কিছু একটা একবার ছিল – মনে আছে। আর প্রতিমাগুলো বসানো থাকত নানান লেভেলে, যাতে করে ওই বয়েসের আমার মনে বেশ একটা বিভ্রম তৈরী হয়ে যেত। বেশ গতিময় ব্যাপার হত আর কী। সংঘশ্রীতেই প্রথম আলাদা আলাদা পুরুষ-মহিলা লাইন দেখেছি মনে হয়।

সংঘশ্রী যদি মডেলের কেরামতিতে এগিয়ে থাকে, আলোকসজ্জায় এগিয়ে থাকত মুক্তদল। হাঁ করে গিলতাম সেইসব। আর ফরোয়ার্ড ক্লাবের পুজোতে থাকত বিশাল প্রতিমার অবাক-রূপ।

এরই মধ্যে কখনও ছোটমামা নিয়ে যেত কলেজ স্কোয়্যার আর মহম্মদ আলী পার্ক – যেখানে আলোতে-কারুকাজে-অবয়বে ঢের বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকত আমাদের জন্য। ঠাকুর দেখার পর হয়ত পুঁটিরাম। একবার একটা পানের দোকান দেখেছিলাম – যাতে প্রচুর নামী লোকের ছবি। মহম্মদ রফির কথা মনে আছে। তবে একমাত্র তিনিই ছিলেন না – মনে আছে সেটাও।

দশমীর দিন সন্ধ্যেয় মনখারাপ নিয়ে বারান্দায় বসে ঠাকুর বিসর্জন দেখতাম। পার্ক সার্কাসের অসুরের চেহারা খুব তাগড়াই হত – সেটা মনে আছে। মনখারাপের কারণ ছিল – পরদিন বাড়ি ফিরে যাওয়া। আবার পড়াশুনো শুরু হয়ে যাওয়া।

এই এখন চোখ বুঁজে ভাবলে দেখি – ঝুলন্ত বাল্বের সারি বড়ো রাস্তার ধারের বাড়িগুলোর ছাদ থেকে। কোনোটা সবুজ তো কোনোটা হলুদ সেলোফেনে মোড়া। যাদের বাজেট বেশী, তাদের সজ্জায় জায়গা পেত চন্দননগরের আলো, তাতে মনীষীদের ছবিই বেশী। দু-চারটে জোকার-টোকারও থাকত। পুজো শেষ হলে সকালে দেখতাম – ওই সেলোফেনের মধ্যে মরে জমে আছে অসংখ্য শ্যামাপোকা।

আমার ভালো পুজো নিয়ে লেখার অছিলায় উপুড় করলাম মৃত স্মৃতিদের সঞ্চয়। আলোর সেলোফেনের মোড়কের মতন পরিত্যক্ত, অবিয়োজ্য।

(লেখাটি ছয়লাপ ওয়েবপত্রিকার উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত। এইখানে ক্লিক করলে লেখাটি পত্রিকার পাতায় পড়া যাবে।)

Advertisements

ঈশ্বরের চলাফেরা ও কালক্রমে মৃত্যু

Standard

Bloch-Sermon-on-the-Mount

ঈশ্বর আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন পাহাড়ের চুড়োর দিকে। সেথায় ফলের গাছ ফুলের গাছ সেথায় আমরা ফুল দেখব ফল সেবা করব আর আনন্দে নৃত্য করব হা ঈশ্বর আজ আমাদের বড়ো সুদিন!

আমাদের সমস্ত সম্পর্ক, আত্মীয়তার পাহাড় ভেঙে মায়া-মমতাকে পথভ্রষ্ট কুকুরের মতন ভুলিয়ে রেখে, বালিপাহাড়ের ঢালে আমাদের ছয়াগুলোকে মিলিয়ে দিতে দিতে তাঁবুর আংটা, ঝুড়ি, আসবাবের মায়া ছেড়ে আমরা ঘর ছেড়েছি তোমার হাত ধরে ঠাকুর! আমাদের কালোরুগ্ন মেয়েছেলেরা, আমাদের টিউবলাইট পরিণয়, আমাদের জং-লাগা আলোর মজা আর রক্তপুণ্য সন্ততি তোমার আশিসে এ-সবই ভুলে গেছিলাম আমাদের ছিল শুধু যাত্রা তোমার নিজের হাতে বারোটা তারা আকাশে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন – যেমন বাজীর মতন মিলিয়ে যায় তারা…

আমাদের অসুখসমূহের নিরসনের মোহে তোমার পিছু-পিছু আমাদের সমস্ত মন আমাদের ভবিতব্য ফুল আর ফলের দিকে তবু দৃষ্টি নয় কারণ তার দেখা আজও আমরা পাই নি। আমাদের গায়কেরা আরাধনায় প্রস্তুত করেছে নিজেদের, বাদকেরা নৃত্যে আর, যে কিছুই পারে না সে বাক্যভারের মালা জড়িয়ে দেবে তোমার হাতে নয়তো বেকুবের মত মদমাংসে খুশ হয়ে বুঁদ হয়ে থাকবে কারণ সেও পাপী পাপ-ভিন্ন বিশ্ব নাই। তার জন্যে রইল বিস্ময়, চঞ্চলতা আর ভয়।

জলপাই বাগানের পথে যেখানে আত্মা শান্তি পায় যেখানে দেবদূত আহ্বান করেন প্রেতের তার কোলসরোবরে পা-দুটি ধুতে ধুতে ঈশ্বর ক্ষণিক থামেন। তাঁর অনির্বচনীয় কলায় আমরা মন্ত্রাহত আমরা উদ্বেল। অর্জিত ক্লেদ ধুয়ে ভ্রমণোৎসুক পুণ্যপিপাসু আমাদের দিকে চেয়ে তিনি অতঃপর ঘোষণা করেন –

মানবের সন্তানদের হাতে নিহত হওয়ার বাক্য

(এই লেখা ‘অনুভব’ ওয়েবপত্রিকার উৎসব ১৪২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত। এইখানে ক্লিক করলে পত্রিকার পাতায় লেখা দেখতে পাওয়া যাবে।)

A MONOLOGUE ON MOTHER

Standard

 

মা গো আমি হীনদীন তোমার কী গুণকীর্তন করিব, কেন না মাতা মাত্রেই হয় আধার, গুণেরই কি বা। আহা আমার চন্দ্রশোভা চারিপার্শ্বে যাহা আচ্ছাদিল, তাহা তোমারই কি গুণে কি বা কলঙ্কে। মাতঃ আমি সমস্ত অর্জিত কলঙ্কে ও পুণ্যে মনঃ ও কায়ায় তোমার আরাধনা করি। আমার পাপজিহ্বাগ্রে সুবাণী অধিষ্ঠিত হৌন।

এ জগতসংসার যখনি আবিল নহে, তোমার গর্ভপুষ্করিণীতে ভ্রমতঃ তোমারই খাদ্য আহারিতেছি, কি বা সেই স্বরবর্ণশব্দসমূহ যাহা তোমা-হইতে আমার প্রথম দীক্ষাস্বরূপ। মাতা আমি সমস্ত বর্ণেশব্দে তোমার মন্ত্র উচ্চারণ করতঃ সদাভ্রাম্যমাণ। অরঙ্গ আশ্রয়ে মুমূর্ষুপ্রায় আমি অসঙ্গীত ভালোবাসিলাম কেন না সকল তোমা হইতে আসিল তাহা সঙ্গীত জ্ঞান করি। শ্বেতকৃষ্ণ আচ্ছাদনে আমি তোমা পানে চাহিলাম আমার রক্ষা হৈল মাতা আমি সুর শুনিলাম তাহা সঞ্জীবনীপ্রতিম।

অমান হৈতে আন্তরিকতম অমানাভাবে পূর্ণ জীবন লভিলে আহা প্রগাঢ় সংকট তথাপি কত না মেষস্বপ্ন প্রতিভাত হয় বস্তুত প্রকৃত স্বপ্ন সভ্যতার শকটস্বরূপ জানি। তোমা-দ্বারা মৎস্যপুষ্টি তোমার করুণা মাতা তোমা-ভিন্ন ধারণ অসম্ভবে আমি রহি সুঋণী। সে-হর্ম্ম্যটি বিশিষ্ট তথাপি তাহা ও পিতৃজীবন তাহা অপেক্ষাও অ-দৃষ্ট সুন্দরতর এই আশ্বাস বোধ হয়। আহা সেথা না কত পুষ্প কত না প্রভাব। আমি আত্মীয়ানাত্মীয় বন্ধুপরিজন স্বপ্নোৎকর্ষে দূর রাখিলাম আমি পৃথক পথে চলিব কেন না সর্ব পথে মনুষ্যের দর্শন হয় নবতর পথ হৈল আমার পথ।

সংসারের সমস্ত পাপাভিশাপ তোমা পরে বর্ষিত হইবে যাহা আমাতে ন্যস্ত হইয়াছে অথবা কালক্রমে মাতা আমি তোমাতে বিশ্বস্ত রহিয়াছি বুঝ কি বুঝ না নিজ আহার্য আমি ক্রমে যদিচ গ্রহিলাম আহা সে অমৃত। আমি তোমার মেষস্বপ্ন পালনে প্রতিশ্রুত রহিলাম তুমি বুঝ কি বুঝ না।

অপরিতলের মনুষ্য গ্রহিলাম যেহেতু তোমার দৃষ্টিতে কি বা আমি শক্তিধর হৈ। তথাপি এ-জীবে বিশ্বাবিষ্ট করিবে সে-ইচ্ছা তোমার অনিবার্য হয়। তোমার আজ্ঞা লঙ্ঘিলাম, আহা সুখান্তর বড়ো মধুর এ-ভাবনা কিছু অনিত্য তবু। রৌপ্য যাহা হারায়, পরিবর্তে রাখি এক সহস্র একশত রৌপ্য চৌর্যবৃত্তি অস্বস্তির কলঙ্কের তবু। অর্জনে ঘৃণা ও বিদ্বেষ বিশেষ বীরত্ব – আমি ঘৃণা দূর রাখি রৌপ্য, সুখ নহে, দিলাম। সুখান্তর তাহার অংশে আমি তোমা পূজিলাম তুমি গ্রহণ করো।

তোমার অপার দয়ায় আমি বিজিতদের করুণা বন্টন করিয়াছি স্বীয় সসাগরা বিশ্বের অধিরাজ আমি তোমার কীর্তি গাহি প্রসন্ন হও। স্বর্গের অতীত জন্মভূমি-অপেক্ষা অধিকতর তোমারই শিক্ষাবলে আমি নিষ্ক্রমণে বাহিরিলাম ফল-শস্য- প্রবৃত্তি অভিজ্ঞতা করিলাম তোমার বন্দনা করি।

মাতঃ আমি তোমা পূজি জন্মাবধি শিক্ষার সংস্কারে যদিচ পথ দূর গিয়াছে সেই স্বপ্নের পথ মাতা আমার বিন্দুটি হয় স্থান-পরিবর্তনশীল। তথাপি সর্বনাশ হয় জীবনের ভাগ মাতা আমি সর্বনাশ তোমা সঁপি তোমার উপস্থিত স্নেহ কামনা করি। আমি সৃজিলাম এ সর্বহন্তারক বিশ্ব তোমার তাহা নহে মাতা আমি তোমার আশিস প্রার্থনা করি আমাদিগে উদ্ধার করো পূতপবিত্র করো আমাদিগের সন্তান রক্ষা করো। আমরা ভবিতব্য আশ্লেষ অবহেলা কার্যত প্রস্তুত করিব কেন না মৃত্যু হয় আমাদিগের ভবিতব্য।

ঐহিক পত্রিকার ‘অর্যমা ঃ ২১ কে মনে রেখে’ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত 

প্যালেস্টাইনের কবিতা

Standard

 

শৈশব – ইব্রাহিম নাসরাল্লাহ্‌

তিনটে ছোট-ছোট স্বপ্ন, একলা
একটা বাড়ীর খোঁজে পার হয়ে
যাচ্ছিল রাত, ঠিক যখন
গোলায় গুঁড়িয়ে গেল বাচ্চাটার বুক

 

স্বভূমি – ইব্রাহিম নাসরাল্লাহ্‌

আমাদের ভোরের জোয়ালের নীচে
গুঁড়ো হয়ে যায় সূর্য
আর পা-ফেলার অন্ধকারে
হাঁফ-নিঃশ্বাসে আগুন ধরে যায়
এই আধখেঁচড়া স্বদেশে
নিজেদের যুদ্ধবন্দী বলে মনে হয়

 

ব্যতিক্রম – মুরীদ বারঘুতি

সকলেই পৌঁছয়;
নদী আর ট্রেন
শব্দ, জাহাজ
আলো ও সংবাদ
সান্ত্বনার টেলিগ্রাম
নেমন্তন্নের চিঠি
দূতাবাসের ডাক
মহাকাশযান
পৌঁছয় সব
থেমে থাকে আমার চলার পথ
আমার দেশের দিকে…

রসেবশে নভেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত

ভীলেদের গল্প

Standard

(ছোটদের জন্যে)

ভীল কাদের বলে জানো? আমাদের দেশে যত আদিবাসী মানুষ থাকেন, তাঁদের মধ্যে সবথেকে বেশী সংখ্যক মানুষ ভীল গোষ্ঠীর। গুজরাট, মধ্য প্রদেশ, ছত্তিসগড়, মহারাষ্ট্র আর রাজস্থান – এই ক’রাজ্যেই মূলতঃ এঁদের বাস।

ভীলেরা এককালে ছিলেন যাকে বলতে পারো ‘হান্টার-গ্যাদারার’। ছোট ছোট জীবজন্তু শিকার করে, বনের ফলমূল কুড়িয়ে এঁরা নিজেদের পেট ভরাতেন। এ-ছাড়া, বাড়ীতে গরু, ছাগল, মুরগী পালন করেও সংসার চালাতেন কেউ কেউ। ভীলেরা খুবই গরীব মানুষ আসলে। তবু এঁদের হাতের কাজ আর নাচ দেখার মতন। আজকাল অবশ্য চাষবাসই এঁদের মূল পেশা।

এতো গেল এঁদের সম্বন্ধে দু’কথা। এই ভীলগোষ্ঠীর একটা প্রাচীন গল্প আজ তোমাদের শোনাই।

একদিন মহাদেব, মানে আমাদের শিবঠাকুর, আর পার্বতী দুজনে বসে মর্ত্যের হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করছেন। মানে, কি করলে কি হয় এইসব আর কি। এমন সময় পার্বতীর ভাইয়েরা এলেন দিদির সঙ্গে দেখা করতে। ব্যাস, ভাইবোনে এক হলে যা হয়। গল্পে গল্পেই অনেকটা সময় কেটে গেল। এতোটাই, যে ভাইদের চলে যাওয়ার সময় যে কখন হয়ে এসেছে পার্বতী তা খেয়ালই করেন নি। তা, খেয়াল করে মনটা ভারী হল বটে, কিন্তু একটা ভাবনাও পার্বতীর মাথায় এলো। ভাইয়েরা এতোটা পথ উজিয়ে দেখা করতে এল। ওদের তো একটা উপহার-টুপহার কিছু না দিলেই নয়!

কিন্তু কি দেওয়া যায়? এই কৈলাসে সংসার। আর চ্যালাচামুণ্ডা বলতে তো ভূতের দল। স্বামী মহাদেবও তো সর্বত্যাগী। কি করবেন-কি করবেন সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে কিছুই না পেয়ে পার্বতী সেই মহাদেবেরই দ্বারস্থা হলেন। বললেন – ‘আপনি একটা ব্যবস্থা না করলে তো সম্মান থাকে না’।

মহাদেবও পড়লেন আতান্তরে। তিনি ভিখারী সাধু মানুষ! কোথায় কিই বা পাবেন উপহার দেওয়ার যোগ্য? তা-ছাড়া শালারা সব রাজার ছেলে। তাদের তো দেব বললেই কিছু দেওয়া যায় না! তবু অনেক ভেবেচিন্তে তিনি মনে মনে একখানা রূপোর কলসী তৈরী করে শালাদের বাড়ী ফেরার পথে রেখে দিলেন। কিন্তু পার্বতীর ভাইয়েরা চলে যাওয়ার সময় নিজেদের মধ্যে গপ্পে এতই মশগুল যে সেই কলসী তাদের চোখেই পড়ল না।

পার্বতীর মনের দুঃখ আর ঘোচে না। ভগবান মহাদেবের দেওয়া উপহার ভাইয়েরা দেখল না? কি করা যায় ভাবতে ভাবতে আবার তিনি শিবঠাকুরের শরণ নিলেন। বললেন, ‘আপনি এবার এমন কিছু ওদের দিন যার থেকে শিক্ষা নিয়ে ওরা জীবনে উন্নতি করতে পারে’। মহাদেব বললেন – ‘তথাস্তু’! বলে-টলে তিনি নিজের ষাঁড় নন্দীকেই পাঠিয়ে দিলেন শালাবাবুদের কাছে।

পার্বতী তো মহা খুশী। এতোটা আশা করেন নি তিনি। তিনি তো জানেন, নন্দী মহাদেবের কত প্রিয়। সেই প্রিয় নন্দীকেই তিনি উপহার দিয়ে দিলেন। ভাইদের বললেন – ‘দেখো। আমি তোমাদের দিদি। আমার কথা শোনো। এই ষাঁড় মহাদেবের অত্যন্ত প্রিয় প্রাণী। খুব মন দিয়ে এর যত্ন কোরো। তোমাদের ভালো হবে। অনেক ধনসম্পদ হবে।’ ভাইয়েরাও মহা খুশী। তারা ড্যাং ড্যাং করে নন্দীকে নিয়ে বাড়ী চলল।

পার্বতীর কথায় তারা নন্দীকে ভালোমন্দ খাওয়ায়, স্নানটান করায়। বেশ যত্নেই রাখে। এমন করে দিন যায় মাস যায়। কিন্তু কিছু পাওয়া যায় না নন্দীর থেকে। কাঁহাতক ধৈর্য রাখা যায়? একটু একটু করে রাগতে রাগতে রাগ একদিন চরমে উঠলে ভাইয়েরা মিলে ফন্দী করল নন্দীকে জবাই করে দেখবে তার ভেতরে সত্যিই কি কি ধনরত্ন লুকোনো আছে। ব্যাস, যেমন কথা তেমন কাজ!

খবর গেল পার্বতীর কানে। সব শুনে তিনি একাধারে ভাইদের নির্বুদ্ধিতা আর লোভের জন্য যেমন লজ্জিত হলেন, তেমন রেগেও গেলেন প্রচণ্ড। তাদের ডেকে এনে তীব্র ভর্ৎসনা করলেন পার্বতী। ‘বোকা ছেলেরা, তোমরা জানো না স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল এই তিন ভুবনের মধ্যে নন্দী সবথেকে শক্তিশালী আর পবিত্র? মহাদেব নন্দীকে তোমাদের কাছে দিয়েছিলেন জমি চাষ করে সোনার ফসল ফলাতে। তা না করে লোভের বশে ওকে তোমরা মেরেই ফেললে? এমন আক্কেল তোমাদের?’ প্রচণ্ড রাগে তিনি অভিশাপ দিলেন ভাইদের, যে তারা বা তাদের বংশের কেউই আর চাষবাস করতে পারবে না।

ভীলেরা মনে করেন তাঁরা দেবী পার্বতীর ভাইয়ের বংশধর। আর তাঁর শাপেই চাষবাস করা তাঁদের হয়ে ওঠে না।

তবে সেই শাপ আজ কেটেছে, কি বলো?

ঐহিক ‘হযবরল’ সংখ্যায় প্রকাশিত

গায়ক সম্বন্ধে মনগড়া ক’টা কথা

Standard

 

2874219370_dc51cd0ed1

দেবব্রত বিশ্বাসকে আমি একবারই দেখেছি।

 

সেটা ১৯৮০ সালের ১৮ই আগস্ট। জগদ্বন্ধু ইশকুলের ক্লাস ফোরে পড়ি মনে হয়। মা স্কুল থেকে নিতে আসত রোজ। মা এসে বলল – দেবব্রত বিশ্বাস মারা গেছেন।

 

মাঝে মাঝে স্কুল থেকে হেঁটে আসার বায়না করতাম। আসলে, এটা-ওটা কেনার উপায় হত তা হলে। আনন্দমেলার সামনে থেকে স্পোর্টস স্টার বা স্পোর্টস ওয়র্ল্ড, বা শুকতারা – নন্টে ফন্টে – হাঁদা ভোঁদা। নিদেনপক্ষে গড়িয়াহাটের ইন্ডিয়ান সুইটস থেকে গুজিয়া বা কাজু বরফি। যদিও বেশীর ভাগ দিনই প্রতিজ্ঞা করে নিতাম যে কোনো বায়নাই করব না। সেদিনও ওরকমই কিছু একটা করে থাকব। যার ফলশ্রুতি – ওই গরম মাথায় নিয়েও হেঁটে ফার্ণ রোড থেকে শানগর রোডে ফেরা।

 

হেঁটে হেঁটে দেশপ্রিয় পার্কের কাছে এসে দেখি অনেক লোক। অনেক, মানে ঠিক কতটা ভীড় সেটা আমার মনে নেই। ধীর গতিতে একটা ডালা খোলা ম্যাটাডোর এগোচ্ছে। তাতে শুয়ে আছেন গেরুয়া-পরিহিত, সাদা দাড়িতে মুখ-ঢাকা, কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া দেবব্রত বিশ্বাস। ফুলের মালা, দীপের আলো, ধূপের ধোঁয়া…

 

প্রিয়া সিনেমার ঠিক উলটোদিকের ফুটপাথে একটা দোকানের সামনে, মানে সিঁড়িতেই, অত্যন্ত সুদর্শন এক মানুষ বসে আছেন। মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরা। মুখ রক্তবর্ণ। অত্যধিক গরমে, পথক্লান্তিতে, বা শোকে। ওই চেহারাটা আমার পরিচিত। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁকে খবরের কাগজের বাতাস দিচ্ছেন সুচিত্রা মিত্র। ম্যাটাডোরে মাথার কাছে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। মা চিনিয়ে দিল।

 

ছোটবেলায় রেডিওতেই প্রথম শুনেছি ওঁর গান। শুকতারা নিয়ে রবি ঠাকুরের কোনো একটা গান। একটুও ভালো লাগত না তখন। ভ্যাঙাতাম, বেশ মনে আছে। ওইজন্যেই শুকতারার কথাটা মনে আছে আর কি! আসলে, সবার থেকে অন্যরকম তো। ওরকম ভারী গলা। তখন নিতে পারতাম না।

 

আমার মন দিয়ে শোনা দেবব্রতর প্রথম রেকর্ড – যেটা কি না ১৯৮০ সালে বেরিয়েছিল – বোধ করি ওই নিজের লেখায়-সুরে গানগুলোর। ‘ক্যারে হ্যারায় আমারে গাইতায় দিলা না’, ‘চান-সুরুজ-গ্রহতারা ভরা আসমান’ ইত্যাদি। ওঁরই একটা সাক্ষাৎকারে পরে শুনেছি – উনি বলেছিলেন গানের কথা রবিঠাকুরের থেকে ধার করা, আর সুর প্রচলিত লোকগান থেকে।

 

এই গান শোনার অনেকদিন পরে, একদিন ‘কোমল গান্ধার’ দেখতে বসেছি। হঠাৎ শুনি ওই সুর – সুরে আছেন সুলেমান, সুরে আসমান / ওই নাম জপো বান্দা আল্লাহ তালার / ও আল্লাহ, লাইলাহাইল্লালা তুর নাম! ‘চান-সুরুজ-গ্রহতারা’! অবিকল এই সুর! ওই ফিল্মেই আরও ছিল ওঁর গান। আহা!

 

তবে ওই গান তখন মনে খুব ধরে নি মনে হয়। নইলে ওই আগস্টের দ্বিপ্রহরে ঘর্মাক্ত শববাহকের ভীড়ে কিছু মুখ দেখে মনে পড়া উচিৎ ছিল – ‘জাইন্যা হুইন্যাও কেউ কোনো রাও করে না’।

 

বাবার কাছে শুনেছি, ‘আকাশ-ভরা সূর্য-তারা’ – এই গানটা না কি ‘কোমল গান্ধার’-এর পর খুব জনপ্রিয় হয়। আর ওই – ‘অবাক পৃথিবী’? পিছনে ঠুকঠাক শব্দ হচ্ছে সেট তৈরীর। ঠিক যেন ‘হাতুড়ি ও বাটালির শব্দে মুখর এ নদীপ্রান্তর’! এর বাইরে ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি’ তো লেজেন্ড হয়ে গেছে!

 

যাই হোক, আমার দেবব্রত বিশ্বাসের গানের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা হল অনেক পরে। ৮৭ সালের আগে নয়। ছুটছাট দু-একটা গান – আবার এসেছে আষাঢ়, আমি চঞ্চল হে, আকাশ-ভরা ইত্যাদি – এগুলো মনে জায়গা করে নিয়েছিল তার মধ্যে। কিন্তু ৮৭ সালে একটা সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটল। ছোটমামা মার্কিন দেশে পাড়ি দেওয়ার সময় তার টেপ রেকর্ডারটা আমাদের দিয়ে গেল। সেই যে তখন শোয়ানো টেপ হত। এর আগে গান শোনা মূলত রেডিওর কল্যাণেই হচ্ছিল। আর কোনো উৎসব – অনুষ্ঠানে পাড়ার মাইকে অল্পস্বল্প।

 

ফিলিপ্স-এর ওই টেপ বাড়ীতে আসার সঙ্গে সঙ্গে যে তিনজন আমাদের – মানে আমার আর দাদার – অগ্রাধিকার পেলেন, তাঁরা হলেন – সুচিত্রা মিত্র, কিশোর কুমার এবং দেবব্রত বিশ্বাস।

 

দেবব্রত বিশ্বাসের প্রথম যে ক্যাসেটটা কিনেছিলাম তার কয়েকটা গান এখনও পর পর বলে দিতে পারব মনে হয়। আকাশভরা সূর্য তারা, বৈশাখ হে, দারুণ অগ্নিবাণে, বহু যুগের ওপার হতে… আমার বিশেষ পছন্দের ছিল – এসো গো, জ্বেলে দিও যাও… কম্পিত বক্ষের পরশ মেলে কি সজল সমীরণে… এছাড়াও – আলোর অমল কমলখানি কে ফুটালে… চৈত্রপবনে…

 

যখন বড়ো হয়ে উঠছি, নিজের পছন্দ-অপছন্দের একটা গতিপ্রকৃত স্পষ্ট হচ্ছে – তখন – সত্যি কথা বলতে কি – নাকে-কান্না জিনিসটা চারদিকের গানবাজনার অনেকটাই গ্রাস করে নিয়েছে। বাংলা গানের যুদ্ধ-পরবর্তী বন্ধ্যাত্ব পপুলার সংস্কৃতি ছেয়ে আছে। হিন্দী ফিল্মের গান শুনেও জুত লাগে না। বাংলা আধুনিক গান ক্রমশ অনাধুনিক হতে হতে প্রস্তরযুগের কড়া নাড়ছে। ‘সারাটি জীবন পালঙ্কে শুয়ে কাটালাম / তোরা এবার আমার মাটিতে বিছানা কর’! ভাবা যায়? বাংলা ফিল্ম মানে অমর সঙ্গী ইত্যাদি – যার কথা বেশী না-বলাই ভালো। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়। নাহ থাক! হেমন্তবাবুর আধুনিক গান যতটা ভালো লাগত (তখনও), ‘অপোরশো আঁচোলেরো’ ততটা কেন, একটুও লাগত না। সুচিত্রার প্রতি ভালোবাসা (গান ছাড়িয়েও একটা শ্রদ্ধার ভাব) অনেকটা পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। কণিকার গানের মাধুর্য বা সুবিনয়ের বৈদগ্ধ্য হৃদয়ঙ্গম করার সাধ্য হয় নি তখনও।

 

নতুনদের কথা কিই বা বলি? আশির দশকে উঠে-আসা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী – এমন কারো নাম মনেই পড়ছে না এখন, এতোটাই অবজ্ঞা দিয়েছি তাঁদের। গাইবার ভঙ্গীতে সেই চিবোনো স্বরলিপির ছিবড়ে। রবীন্দ্রনাথের থেকে তাঁর গানের স্বরলিপির মর্যাদা তখন অনেক বেড়ে গেছে।

 

ওইরকম একটা অবস্থার মধ্যে একমাত্র দেবব্রত বিশ্বাসের গানেই পেলাম আধুনিকতার সংজ্ঞা। অন্য শিল্পীদের সঙ্গে ওঁর তৈরীর একটা ফারাক ছিল। বাকীরা ছিলেন – সুচিত্রা কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম – নিছক রবিগানের শিল্পী। দেবব্রতর বেড়ে ওঠার মধ্যে রবিঠাকুরের গান ছাড়াও ছিল ময়মনসিংহের হাওয়ায় ছড়িয়ে থাকা লোকগান, আর পরবর্তীতে গণআন্দোলনের সূত্রে পাওয়া আরও নানা রকম গান আর সুর। সে-অর্থে, উনি আগমার্কা রবীন্দ্র-ইয়ে ছিলেন না আর কি!

 

সেই কারণেই হয়তো, সমস্ত চালু প্রক্রিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে রবিগানের এই ‘আঁফা তেরিবল’ (প্রতিবর্ণীকরণেও ‘টেরিবল’ হল হয়তো!) স্পষ্ট উচ্চারণে খোলা গলায় গান করছেন। স্বর থেকে স্বরান্তরে যেতে প্রথিতযশা রবিশিল্পীদের মতন ঘাই খেলাচ্ছেন না। অধিকাংশ নামীরাই এই কৌশল নিচ্ছেন কারণ স্বর ধরে রাখার দক্ষতা, অতএব স্বরপ্রত্যয়, তাঁদের নেই।

 

দেবব্রতও কি খুব সঙ্গীতকুশলী ছিলেন? সে-অর্থে হয়তো নয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে – উচ্চাঙ্গসঙ্গীত-নির্ভর রবীন্দ্রনাথের গান খুব কমই উনি গেয়েছেন। ‘বাণী তব ধায়’ – আমার ভালো লাগে না শুনে। কিন্তু ওঁর গানে একটা সততা ছিল। যে-গানে ওস্তাদি লাগে না, সেখানে দেবব্রত অবিসংবাদী রাজা!

 

অন্য প্রতিষ্ঠিতদের ঘ্যানঘ্যানে ইনিবিনি কান্নার পাশে জর্জ বিশ্বাস রাবীন্দ্রিকতার তোয়াক্কা না করে অনায়াসে গানের ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে যান – ‘আর কি / কখনো / কবে / এমন সন্ধ্যা হবে’, আবার পরক্ষণে ভেঙ্গে পড়েন – ‘জনমের মতো হায় / হয়ে গেল হারা’।

 

‘আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে’ – রবিঠাকুরের অন্যতম সেরা কম্পোজিশন। দেবব্রতর কণ্ঠে শুনলে মনে হয় প্রথমে যন্ত্রসঙ্গীতের আলাপের সঙ্গে মেঘসঞ্চার… ‘কূজনহীন কাননভূমি’-র শূন্যতার ওপর মেঘ এসে ভরিয়ে দিচ্ছে তার ছায়া দিয়ে। ছায়া ঘনাইছে মনেও। ‘শ্যামল তমালবনে যে পথে সে চলে গিয়েছিল’, সেই পথেই কি ফিরে আসছে সে? নায়িকা ঘনিয়ে ওঠা মেঘের দিকে দয়িতকে কল্পনা করে তাকান – শ্যাম সে ঘনশ্যাম উমর ঘুমর আয়ো। ওই একটি মেঘপথিককে ডাক দেন – হে একা সখা, আমার ঘর, শয্যা তোমার জন্যেই তো মার্জনা করে রেখেছি। রয়েছে খোলা – কী আর্তি থাকে এই ডাকে? দেবব্রত, আমরা আপনার থেকে জেনেছি। আপনি গান শেষ করলে আমরা দেখেছি খোলা দরজার চৌকাঠে মেয়েটাকে আছাড় খেয়ে পড়তে। ‘যেও না মোরে হেলায় ফেলে’। ‘যেও না…মোরে হেলায় ফেলে’।

 

রাগমালা চিত্রের শিল্পীরা যেমন করে এঁকে দিতেন মল্লার, কানাড়া, ঠিক তেমন করে দেবব্রত আমাদের মনে এঁকে দেন গান। ‘তোমার সে উদাসীনতা সত্য কিনা জানি না সে’, ‘তখন পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল’, বা ‘স্মরণবেদনার বরণে আঁকা সে’। এ ছবি আঁকা নয় তো কি? ‘তুমি তো সেই যাবেই চ’লে’ – এই ‘যাবেই চ’লে’-র অভিঘাত অন্যদের মধ্যে সুচিত্রা মিত্রের ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে’-র সঙ্গেই মনে হয় একমাত্র তুলনীয়। ‘চেয়ে রই রাতের আকাশ-পানে / মন যে কী চায়, তা মনই জানে / আমার মনই জানে।’ একটা বন্ধ দরজার সামনে হাত ধরে নিয়ে এসে দাঁড় করান দেবব্রত। ‘বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর / কেঁপে ওঠে বন্ধ এ-ঘর’ –বাহির হতে আমাদের দুয়ারে কর হানেন। পূজার গান কখন যে মুক্তির গান হয়ে যায় ওঁর কণ্ঠে!

 

১৯৪৭-এ কণক দাশের সঙ্গে গাইলেন ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’। হয়তো নবলব্ধ স্বাধীনতার কথা মাথায় রেখেই। তবে সে-গান একটু ধীর লয়ে গাওয়া। সঙ্গে একটা ভারী ড্রামের বীট। সে-যন্ত্রকে কি বলে জানি না। হৃৎস্পন্দনের মতন পড়ছে, আর ভেতরটা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। অন্যটা ছিল আরেকটু বেশী ইন্সট্রুমেন্টেশন নিয়ে। আরেকটু দ্রুত লয়ে। রেকর্ডিং-এর সাল আমার জানা নেই। তবে শুনে মনে হয় ৪৭-এর পরে কখনও। শুনলে, সত্যি কথা বলতে কি, সলিলবাবুর ওই সময়কার গানগুলো মনে পড়ে। ওই যে – ‘আমার প্রতিবাদের ভাষা’! মনে হয় গায়ক স্বয়ং মশাল হাতে হাঁটছেন মিছিলের সামনে। অনেকের কণ্ঠে এই গান শুনেছি। তাতে উদ্দীপনা জাগানোর চেষ্টা আছে হয়তো। আগুন জ্বালাবার অঙ্গীকার নেই। ভাবনাতে ঝড়ের হাওয়া ক্রুন করে লাগানো যায় না হে!

 

আমরা যখন একেবারে দেবব্রত-গ্রস্ত, সেই সময়ে আমার আর দাদার একটা প্রিয় খেলা ছিল। আচ্ছা, ওই গানটা, ‘ক্ষমিতে পারিলাম না যে ক্ষম হে মম দীনতা’, ওটা দেবব্রতর করে গা তো দেখি? বা ‘পাণ্ডব আমি অর্জুন গাণ্ডীবধন্বা’! আসলে, অনেক শোনার ছিল। কতটুকুই বা শোনা হল ওঁকে? কল্পনাতেও পাওয়ার কথা মনে হয় তাই। ১৯৬০-এর ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’। দেবব্রতর কণ্ঠে তখন কি যাদু ছিল সে আমাদের অজানা নয়। ১৯৬৪ সালে ওঁর গানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গেল। তারপর দীর্ঘ ষোল বছর উনি আমাদের সঙ্গে রইলেন। আমরা কী পেতে পারতাম, সেটা একবার ভাবব না?

 

দেবব্রতর খুব জনপ্রিয় গানগুলো হিন্দুস্থান রেকর্ডস থেকে বেরিয়েছে। একটা ক্যাসেট হাতে এসেছিল, যাতে ছিল আরও আগের এইচ এম ভি থেকে প্রকাশিত কিছু গান। ‘আছ আকাশ-পানে তুলে মাথা’, ‘ওগো, পথের সাথি, নমি বারম্বার’, ‘এই তো ভালো লেগেছিল’ – এইসব গান। আহা! অমন বাস ব্যারিটোন কণ্ঠ! খুব চলতে দেখিনি ওইসব গান।

 

তার বদলে নানান অদ্ভুত লেবেলে আজকাল দেবব্রতর গান দেখতে পাই বাজারে। অশক্ত শরীর, কণ্ঠ চলে না – এরকম অবস্থায় গাওয়া গান সব। শুনে কষ্ট হয়। ভালো তো লাগেই না। যাঁরা এই গানগুলো বাজারে বেচেন আর যারা কেনেন, দু-পক্ষের প্রতিই আমার তীব্র বিরাগ।

 

নিস্তরঙ্গ কালো জলে বাইন্যার নৌকা ভাসে / কালিকটের ঘাটে আর সুতানুটির বাঁকে… আমরা হলাহলেই দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। মনে হয়।

 

আমি জানতাম না গতকাল ওঁর জন্মদিন ছিল। সকালে যখন খুব বৃষ্টি পড়ছে, তখন অফিসের পথে বর্ষার গান শুনতে গিয়ে ইউটিউবে একের পর এক দেবব্রতরই গান শুনছিলাম। পরে জানলাম। মানে, জন্মদিনের কথাটা। এই কটা নিজের কথা লিখতে ইচ্ছে হল।

অজ্ঞানতিমির, গুরু, নাশ করো… টেইল এন্ডার, অথবা, নাইটওয়াচম্যানের স্বীকারোক্তি

Standard

It is far more than a game, this cricket. – Neville Cardus

উল্টোদিকে ধেয়ে আসছে বিপক্ষের ভয়ঙ্করতম আক্রমণ। চারপাশের সবুজে-মোড়া বাস্তবের মধ্যেকার যে একফালি ন্যাকড়ার মত লালচে মাটি, সেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকাটাই কাজ। একমাত্র লক্ষ্য। পড়ে থাকতে হবে। ধরে থাকতে হবে। যে-যে বিদ্যায় পারদর্শিতা – ধনুর্বিদ্যা, ভূগোল বা অ্যাকাউন্টেন্সি – সেই চেনা পরিধির ঠিক বাইরে থেকে আসবে অ্যাটাক। বিপক্ষের ভয়ঙ্করতম অ্যাটাক। দুর্বলতম পয়েন্ট লক্ষ্য করে।

অ্যামফিথিয়েটারের কোণে কোণে পোকার মতন পুঁজিয়ে থাকা মজালুটিয়ে দর্শকদের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে ধরা রইল সমর্থনের পরিমাপ। প্রান্তবাসী, যারা সাফল্যে নেচে ওঠে অশ্লীল, আর ব্যর্থতায় ভঙ্গুর বৃষ্টির মতন ঝরে যায়- তারা তাকিয়ে আছে পোষ্যের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে। লড়াইয়ে ভাগ না-নেওয়া, দুর্বল, অপ্রাসঙ্গিক আমোদগেঁড়ে – কমরেডস – পথ-চলার সাথী। তারা দলের, দেশের সমর্থক। দেশ – যে ময়দানী ক্লাব তোমার-আমার হিংসাচর্চার স্থান। নিয়ন্তার ছেড়ে-দেওয়া জন্তুর সঙ্গে লড়াইয়ে কখনও আঙ্গুল উঠবে, কখনও নামবে।

ব্যাডলাইটের পূর্বমুহূর্তে, যখন প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাহীন তবু রুদ্ধশ্বাস, চারপাশের আধখানা ঢেকে ফেলেছে কালো ছায়া – তখন হয়তো জ্ঞান গোঁসাই শ্রীরাগে ধরেছেন মহাদেব-ভজনা – যোগীশ্বর হর ভোলা মহেশ্বর / ভস্ম অঙ্গে, শিরে রঙ্গে গঙ্গাজল – গোধূলি-পরবর্তী সেই মুহুর্তকেই আক্রমণের আছড়ে পড়ার প্রকৃষ্টতম মুহুর্ত বলে চিনে নিতে হবে। যাঁরা রক্ষক হতে পারতেন, তাঁরাই পাঠালেন রক্ষণে – যাতে শেষবেলার আলোআঁধারিতে আঘাত তাঁদের না পেতে হয়। নায়কের বিমান উড়ছে, উড়বে! অনিশ্চয়তা মহানের জন্য নয়!

শাস্ত্রে বলে এক মুদ্রাক্ষেপে জয়ের সম্ভাব্যতা অর্ধেক। আর একটি জেতা-টসে হারার সম্ভাব্যতা? অসংখ্য! সুতরাং, আমাদের ব্যক্তিগত গন্তব্যগুলোকেই জিত বলে মনে হয়। পাহাড়-সমুদ্রের যুদ্ধ, ফ্লাইওভারের দেহালঙ্কার, শপিং মলের সন্ত্রাস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যার-যার অর্গ্যানিক পথে গন্তব্যে ফেরা। এইটুকুই তো…

এই আলোধোয়া ধরায় ঝড়বিধ্বস্ত বক আকছার মরিয়া থাকে। সুতরাং তুমিও বাঁচিয়া থাকিতেই পারো, মরিবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। তাহারই বীচ-বীচ মহামায়ার অসীম কৃপায় যে দু-একবার ব্যাটে-বলে হইবে, তাহাকেই সাফল্য জানিও!

কুড়ি লক্ষ বছরের ঘষামাজা করা মগজে আঁকড়ে ধরে রাখা কয়েকটা শিক্ষা, তারই নাম দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা। মহাবিশ্বের কোটি সৌরজগতের মধ্যে স্বপ্নলোকের চাবির হদিস-জানা এই যেন এক, প্রজ্ঞা! তারই কাছে হাত পাতার অভ্যাস। অথচ প্রজ্ঞা এক শৈলী ছাড়া তো কিছু নয়! এই প্রজ্ঞা দিয়েই বানিয়েছি অযুত পাঁচিল। বন্ধু, এ-যাত্রা তুমি থামাও…

প্রজ্ঞা – সফল জীবনের মন্ত্র, শিল্পের আধার। না! শক্তির উৎস, ধ্বংসের কারক। শুদ্ধির কথা আজ থেকে অন্তত অর্ধ শতাব্দী আগে শেষবার উচ্চারিত হয়েছে, মনে হয়। প্রজ্ঞার শক্তিরূপী বিকাশ যিনি জানেন, খেলার চাবিকাঠিটি তাঁরই হাতে। আক্রমণের সাফল্য মেপে নেওয়া ধ্বংসের পরিমাণে।

নিজের সৃষ্ট উপাদান দিয়ে নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করা। যাবতীয় ঠিক-ভুল, ন্যায়-অন্যায়ের হিসেব জমা হচ্ছে – ঈশ্বরের অবর্তমানে – শুধু ক্রমিক সংখ্যার ভিতর। সিস্টেমই শেষ কথা বলতে চাইছে। আলো পড়ে আসছে, মুঠি কঠিন হয়ে আসছে। নিয়মের সঙ্গে সাযুজ্য রাখার খেলায় ক্রমশই পিছু হটা।

ক্রীড়াবিদ হয়ে উঠছেন ক্রীড়নক। সভ্যতার বিবর্তনের খতিয়ান। মোর শকতি নাহি…

দিশাহীনতার নাম ভবিতব্য। অর্থাৎ, যাহা ঘটিবে।

মহা-আশঙ্কা জপিছে… তবু তারই মধ্যে কোনো এক মোহে… টিঁকে থাকার তীব্র এক মোহ আছে। না কি, ধ্বংসের মোহে ঢাকা পড়ল সব?

পুরোনো সময় চলে গিয়ে ক্রমে নতুন সময়ের জন্ম হয়। নতুন সময়ের নতুন মাপ, নতুন একক। সর্বব্যাপী ধ্বংসের ব্যাখ্যানে সৃষ্টিকে মনে হয় তাৎক্ষণিক সুখ। স্লো-মো ক্যামেরায় বারংবার আঘাত বা পরাজয়ের ছবি। জয় যেন একটা তাৎক্ষণিক অনুভূতি।

রাত পেরোলে, কাল সকালে, শিশির থাকলেও… দিনটা নতুন হবে। নতুন আক্রমণের সময় হয়েছে যেমন, তেমনই সময় হয়েছে নতুন করে তার মোকাবিলার। সবার চোখের আড়ালে তৈরী রেখেছি নতুন খেলার ছক।

নতুন নিয়ম। নতুন ব্যাকরণ।

‘ঐহিক’ খেলা যখন @ বিয়ন্ড ক্রিকেট অগাস্ট ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত