কার্ল মার্ক্সের ‘পুঁজি’-র সহজ পাঠ: পর্ব ২

Standard
কার্ল মার্ক্সের ‘পুঁজি’-র সহজ পাঠ: পর্ব ২

পরিচ্ছেদ ১: পণ্য (কমোডিটি)

মার্ক্স পুঁজিবাদের সমালোচনার সূত্রপাত করলেন অতি সাধারণ, আটপৌরে একটা জিনিস দিয়ে। তার নাম জিনিস, বা কমোডিটি, বা পণ্য। দাস কাপিতালের শুরুটা হচ্ছে এইভাবে –

যে সমস্ত সমাজে উৎপাদনের ধনতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রচলিত থাকে, সেখানকার ধনসম্ভার প্রতীয়মান হয় ‘পণ্যের এক বিপুল সম্ভাররূপে। এক একটি পণ্য তার এক একটি একক। কাজেই আমাদের তত্ত্বজিজ্ঞাসা শুরু করতে হবে যে-কোনো একটি পণ্যের বিশ্লেষণ থেকে (অনুবাদ – পীযূষ দাশগুপ্ত)।

  • মার্ক্স, দাস কাপিতাল

আমরা সকলেই বিলক্ষণ জানি যে পণ্য বা কমোডিটি এমন একটা জিনিস যার হয় কেনাবেচা হয়ে থাকে, অথবা সমগুরুত্বের (সমমূল্যের – না-ও হতে পারে) অন্য কোনও পণ্যের সঙ্গে বিনিময় হয়ে থাকে (যেখানে টাকাপয়সার গল্প নেই)।

আর এটাও জানি, যে কেনাবেচা (বা বিনিময়) যে আদৌ ঘটে তার কারণ পণ্য মানুষের কাছে একটা কাজের জিনিস।

তার মানে, একটা পণ্যের দুটো দিক রয়েছে। একটা যদি হয় তার ব্যবহারিক গুরুত্বের দিক, অন্যটা নিশ্চিতভাবে তার বিনিময়মূল্য। একটা পণ্যের বিনিময়মূল্য হল সোজা কথায় তার দাম।

তাহলে, পণ্যের শুরুওয়াতি সংজ্ঞা হল এইরকম: যে কাজের জিনিস কেনাবেচা হয় তা-ই হল পণ্য। এভাবে বললে পণ্যের দুটো দিকেই – ব্যবহারমূল্য (কাজের জিনিস) আর বিনিময়মূল্য (কেনাবেচা) – একসঙ্গে নজর দেওয়া যায়।

প্রথম দৃষ্টিতে পণ্যকে মনে হয় যেন একটি তুচ্ছ বস্তু এবং সহজেই বোধগম্য। কিন্তু বিশ্লেষণের ফলে দেখা গেলো যে তা বহু আধ্যাত্মিক (theological) ও আধিবিদ্যক (metaphysical) সূক্ষ্ম তত্ত্বে পরিবৃত একটি অদ্ভুত ব্যাপার (অনুবাদ – পীযূষ দাশগুপ্ত)।

  • মার্ক্স, দাস কাপিতাল

পণ্যকে সাদা চোখে একটা মামুলি সহজবোধ্য জিনিস বলে মনে হলেও মার্ক্স দেখাচ্ছেন যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে কোনও জিনিসকে যেমন দেখায়, আদতে সেই জিনিসটা তেমন না-ও হতে পারে।

আসলে, আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পণ্যের এই ব্যবহারমূল্য আর বিনিময়মূল্য মধ্যেও যে একটা লড়াই আছে, বিশ্লেষণের মাধ্যমে মার্ক্স সেটাই দেখাচ্ছেন।

প্রথমে ব্যবহারমূল্যের দিকটা দেখা যাক। যে কোনও কয়েকটা পণ্যের কথা ভেবে নেওয়া যাক – যেমন টিব্যাগ, হাতুড়ি আর বাইনোকুলার।

এদের ব্যবহারমূল্যের কথা ভাবতে গেলে আমরা দেখব এইসব জিনিসগুলোর ব্যবহার বা কার্যকারিতা একে অন্যের থেকে কতটা আলাদা। প্রতিটা জিনিসকেই একদম স্পষ্ট আর আলাদা কাজে ব্যবহার করা হয়।

টিব্যাগ দিয়ে পেরেক পোঁতা যেমন অসম্ভব, দূরের জিনিসকে হাতুড়ির সাহায্যে বড় করে দেখাও তেমনি অসম্ভব। নয় কি?

যেকোন জিনিসের ব্যবহার-মূল্যের উদ্ভব হয়েছে তার উপযোগিতা (utility) থেকে। কিন্তু এই উপযোগিতা আকাশ থেকে পড়ে না। পণ্যের পদার্থগত গুণাবলীর দ্বারা তা সীমাবদ্ধ, তাই পণ্য থেকে স্বতন্ত্র কোন সত্তা তার নেই (অনুবাদ – পীযূষ দাশগুপ্ত)।

  • মার্ক্স, দাস কাপিতাল

ওপরে যে জিনিসগুলোর কথা আমরা বললাম, তাদের গঠনের ওপরেই তাদের চেহারাগত আর ব্যবহারগত পার্থক্য নির্ভর করে।

যে টিব্যাগের গায়ে ছোট ছোট ফুটো নেই, তা দিয়ে চা বানানো যাবে কি? না।

যে বাইনোকুলারের ভেতরে লেন্স পোরা নেই, ব্যবহার করা যাবে না তাকেও।

সুতরাং, এইসব জিনিসগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে যে যে জিনিস দিয়ে এগুলো তৈরি, তাদের ওপর, আর তাদের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর।

এই যে জিনিস বা পণ্য, তা তৈরি হয় যে যে উপাদানে, তার যোগান কোথা থেকে আসে? সমস্ত উপাদানেরই জীবন অবশ্যম্ভাবীভাবে শুরু হয় কোনও একটা প্রাকৃতিক সম্পদের রূপ নিয়ে। চা আসে চা গাছ থেকে, টিব্যাগ তৈরি হয় কাঠ আর শাকসবজির আঁশ মিশ খাইয়ে। হাতুড়ির জন্য ইস্পাত তৈরি হয় লোহা আর কার্বনের যোগ ঘটিয়ে। লেন্সের জন্য যে কাচ, তার উৎস বালিকণা আর চুন।

এ কথা বলাই বাহুল্য যে প্রকৃতি নিজের থেকে তার নিজস্ব সম্পদের রূপ বদলে আমাদের আরও ভাল আর আরও আরামে রাখার জন্য এই হাতুড়ি, টিব্যাগ বা বিনোকুলার তৈরি করে দেয় না। এই রূপান্তরের আড়ালে থাকে মানুষের শ্রম (হিউম্যান লেবার), মাঝে মাঝে যা কি না ম্যাজিকের মত কাজ করে।

প্রথমতঃ, শ্রম হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যাতে মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়েই অংশ গ্রহণ করে, এবং যেখানে মানুষ স্বেচ্ছায় তার নিজের এবং প্রকৃতির মধ্যেকার বাস্তব প্রক্রিয়াগুলি সূচনা করে, নির্ধারণ করে, নিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতির উৎপাদন-সমূহকে তার বিবিধ অভাবের সঙ্গে উপযোজিত আকারে আত্মীকৃত করার উদ্দেশ্যে সে নিজেকে প্রকৃতির বিপরীতে স্থাপন করে প্রকৃতিরই অন্যতম শক্তি হিসাবে। এইভাবে বাহ্য জগতের উপরে কাজ করে এবং তাকে পরিবর্তিত করে, সে সেই সঙ্গে তার নিজের প্রকৃতিরও পরিবর্তন ঘটায়। সে তার সুপ্ত শক্তিগুলিকে বিকশিত করে এবং সেগুলিকে বাধ্য করে তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে।

মার্ক্স, দাস কাপিতাল (অনুবাদ – পীযূষ দাশগুপ্ত)

সুতরাং, পণ্যের ব্যবহারিক মূল্যের আসল উৎস হল প্রকৃতি এবং শ্রম। আর এই কথাটা কেবলমাত্র পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার ক্ষেত্রেই সত্যি নয়, মানবজাতির সমগ্র ইতিহাসের ক্ষেত্রে সত্যি। মানুষ চিরকাল প্রাথমিকভাবে ব্যবহারমূল্যের কথা মাথায় রেখেই প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করেছে। আর উৎপাদনের পদ্ধতি এইরকম বলেই সে ক্রমশঃ সৃজনশীল আর বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পেরেছে।

মানুষের এই শ্রম ব্যবহারের পদ্ধতি অন্যান্য জীবজন্তুর সহজাত প্রবৃত্তি ব্যবহারের অভ্যাসের থেকে একেবারেই আলাদা।

একটা মাকড়সা এমন অনেক ক্রিয়া সম্পাদন করে, যেগুলি একজন তন্তুবায়ের দ্বারা সম্পাদিত বিবিধ ক্রিয়ার অনুরূপ, এবং মৌচাক নির্মাণের কাজে একটা মৌমাছি একজন স্থপতিকেও লজ্জা দেয়। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ স্থপতি এবং সবচেয়ে ভাল মৌমাছির মধ্যে পার্থক্য এই যে, স্থপতি তার ইমারতটি বাস্তবে গড়ে তোলার আগে গড়ে তোলে তার কল্পনায়। প্রত্যেকটি শ্রম-প্রক্রিয়ার শেষে আমরা পাই এমন একটি ফল, যেটি ওই প্রক্রিয়ার শুরুতেই ছিল শ্রমিকটির কল্পনা। যে-সামগ্রীটির উপরে সে কাজ করে, সে কেবল তার রূপেরই পরিবর্তন ঘটায় না, সে তার মধ্যে রূপায়িত করে তার নিজেরই একটি উদ্দেশ্য, যা তার কর্মপ্রণালীটিকে করে একটি নিয়মের অনুসারী, যে-নিয়মটির কাছে তার নিজের অভিপ্রায়ও বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য।

মার্ক্স, দাস কাপিতাল (অনুবাদ – পীযূষ দাশগুপ্ত)

মানুষ উদ্ভাবনকুশল হতে পারে, কারণ সে নিজের সৃজনশীলতা আর কল্পনাশক্তির দ্বারা প্রভাবিত, সহজাত প্রবৃত্তিদ্বারা নয়। পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া আর পরিবেশকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা, দুই-ই তার পক্ষে সম্ভব। সে নিজের ভিতরের এবং বাইরের চারপাশের ঘটনাক্রমের কারণ আবিষ্কার করতে সক্ষম। এই কারণেই প্রাকৃতিক ইতিহাসের থেকে সম্পূর্ণরকমের আলাদা পথে মানুষের ইতিহাস তৈরি হওয়া সম্ভব।

মানুষের হাতজোড়ার যন্ত্র তৈরিতে সক্ষম অঙ্গ হিসাবে রূপ নেওয়াটা মানবেতিহাসের একটা মোড় ঘুরিয়ে দেবার মত ঘটনা। মার্ক্সের আজীবনের বন্ধু ও সহযোগী ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস লিখছেন:

…বানর থেকে মানুষে উত্তরণের হাজার হাজার বৎসর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে সব কাজকর্মে তাদের হাতকে ক্রমে ক্রমে অভ্যস্ত করে তুলেছিল, গোড়ার দিকে সেগুলির নেহাতই সাদাসিধে ধরনের হওয়ার কথা। নিম্নতন স্তরের বন্য মানুষেরা, এমন কি যাদের দেহগতভাবে অবনতি এবং সঙ্গে সঙ্গে পশুসুলভ অবস্থায় অধোগতি ঘটেছে বলে অনুমান করা হয়, তারাও এই উত্তরকালীন প্রাণীদের তুলনায় ঢের বেশি উন্নত। মানুষের হাতে পাথর থেকে প্রথম ছুরিখানা তৈরি হবার আগে হয়ত এমন এক দীর্ঘ যুগ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে, যার তুলনায় আমাদের পরিচিত এই ঐতিহাসিক যুগকে মনে হবে একান্তই নগণ্য। কিন্তু তারই মধ্যে চূড়ান্ত পদক্ষেপটা নেওয়া হয়ে গিয়েছিল: হাত হল মুক্ত, তখন থেকে তা অর্জন করে যেতে পারল ক্রমেই বেশি বেশি নৈপুণ্য ও কৌশল; এবং এইভাবে অর্জিত উন্নততর নমনীয়তা সঞ্চারিত হল বংশপরম্পরায়, বৃদ্ধি পেল পুরুষানুক্রমে।

  • বানর থেকে মানুষের বিবর্তনে শ্রমের ভূমিকা, ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস

তার মানে, মানুষ হিসাবে আমরা যেটুকু যা হয়েছি, তার পিছনের আসল কারণটি হল শ্রম। শ্রমের ব্যবহারমূল্য আবার এক-এক রকমের উপাদানের ওপর কাজ করে তাদের এক-এক রকমের গুণপনা বের করে আনে।

আমরা যদি কাগজ তৈরি করতে যাই, তবে কাঠকে লোহার আকরিক মনে করে চুল্লিতে দিলে যা হবার তাই হবে! প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য বা গুণগুলোকে বুঝে নিয়েই শ্রমকে কাজ করতে হবে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমের কোন গতি হয়, সে কথা জানতে এইখানে আমাদের মনে করতে হবে শ্রম ও সৃজনশীলতার অঙ্গাঙ্গীভাবে মিলে থাকা নিয়ে মার্ক্সের রচনার কথা।  

মানবিক শ্রম দুই ধরনের জিনিস তৈরি করতে পারে। প্রথম ধরনটা হচ্ছে ছোট-ছোট যন্ত্রাংশ বা এমন কিছু উপাদান যার ওপরে আরও শ্রম লাগিয়ে অন্যতর জিনিসপত্র তৈরি করা হবে। অন্য ধরনটা হল সেইসব জিনিস যা চূড়ান্ত অবস্থায় ব্যক্তিমানুষের হাতে আসবে, এবং ব্যক্তিমানুষ তাকে ব্যবহার করবে বেঁচে থাকার জন্য – যেমন একটা ঘরের চাল বা কিছু খাবারদাবার।

প্রথম ধরনের জিনিসগুলোর এমন কিছু প্রচ্ছন্ন বা লুকোনো ব্যবহারমূল্য থাকে যেগুলো আরও শ্রম প্রয়োগ করলে তবেই প্রকাশ্যে আসতে পারে।

জীবন্ত শ্রম এদেরকে আয়ত্তে আনবে, মরণ-ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবে, নিছক সম্ভাব্য ব্যবহার মূল্য থেকে এদের পরিবর্তিত করবে বাস্তব ও কার্যকর ব্যবহার-মূল্যে। শ্রমের অনলে অভিষিক্ত হয়ে, শ্রমের দেহযন্ত্রের অঙ্গীভূত হয়ে এবং যেন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াটিতে নিজেদের কর্তব্য-কর্ম সম্পাদনের জন্য সঞ্জীবিত হয়ে, এরা বাস্তবিক পক্ষে পরিভুক্ত হয়, কিন্তু পরিভুক্ত হয় একটি উদ্দেশ্য অনুযায়ী – নোতুন নোতুন ব্যবহার-মূল্যের নোতুন নোতুন উৎপন্ন দ্রব্যের বিবিধ প্রাথমিক উপাধান হিসাবে, যে-মূল্যগুলি তথা দ্রব্যগুলি প্রাণ-ধারণের উপায় হিসাবে ব্যক্তিগত পরিভোগের জন্য, উৎপাদনের উপায় হিসাবে কোন নোতুন শ্রম, প্রক্রিয়ার জন্য সদা-প্রস্তুত।

মার্ক্স, দাস কাপিতাল (অনুবাদ – পীযূষ দাশগুপ্ত)

মার্ক্স বলছেন, ছোট-ছোট যন্ত্রাংশ (বা ক্ষেত্রবিশেষে মেশিনপত্তর) বা কাঁচামাল, নানান উপাদান বা উপকরণের মধ্যেকার প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনাগুলোকে আলোতে আনতে গেলে (বা তাদের লুকোনো ব্যবহারমূল্যগুলোকে প্রকাশ্যে আনতে গেলে) দরকার ‘জীবন্ত শ্রম’ বা ‘লিবিং লেবার’-এর। পরবর্তীতে পুঁজিবাদকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মার্ক্স, আমরা দেখব, তাঁর এই বক্তব্যের ওপরে খুব জোর দিচ্ছেন।

এখন প্রশ্ন হল, কী এই জীবন্ত শ্রম?

কার্ল মার্ক্সের ‘পুঁজি’-র সহজ পাঠ: পর্ব ১

Standard
কার্ল মার্ক্সের ‘পুঁজি’-র সহজ পাঠ: পর্ব ১

জার্মানে যার নাম ‘দাস কাপিতাল’, ইংরেজি অনুবাদে তা-ই ‘ক্যাপিটাল: আ ক্রিটিক অফ পোলিটিক্যাল ইকোনমি’। ক্যাপিটাল-এর সঙ্গে যে লেজুড়টি, তা জার্মান ভাষাতেও আছে। তবে সে-কথা বাংলায় লেখা এতই দুষ্কর যে সেদিক মাড়ালেম না।

এই ‘ক্যাপিটাল’ (বাংলায় ‘পুঁজি’) বইটি রচনা করেন কার্ল হাইনরিশ মার্ক্স, যিনি ছিলেন একাধারে জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সমাজতত্ত্ববিদ, সাংবাদিক এবং আরও অনেক কিছু। তাঁর সম্বন্ধে আমরা মোটামুটি অবগত আছি বলে তাঁকে নিয়ে বিশদে লেখার সাহস দেখালাম না।

মার্ক্সের ‘পুঁজি’ বই নিয়ে কথাবার্তা নিচের লেখাতেই আছে বলে ভূমিকা লম্বা করার প্রয়োজন দেখি না। এখন কেবল ওই ‘নিচের লেখা’ নিয়ে একটামাত্র কথা। ‘দাস কাপিতাল ফর বিগিনার্স’ নামে মাইকেল ওয়েন-লিখিত একটি বই ক’দিন আগে হস্তগত হল। বইটাতে চোখ বুলিয়েই মনে হল এটা বাংলায় অনুবাদ করে ফেললে অনেকের সুবিধে।

আমারও। কারণ ‘পুঁজি’ তো আমিও পড়িনি!

অলমিতি…

(পুঃ – আরও একটা কথা। ক্যাপিটালকে পুঁজি আর প্রফিটকে মুনাফা লিখতে আমার কলম সরে না। কিন্তু পরিভাষা হিসাবে এগুলো এতটাই চালু যে বদলে দিতে সাহস হল না।

ব্যাস, এখানেই আমার মৌলিক রচনার ইতি।)

গোড়ার কথা

কার্ল মার্ক্সের দাস কাপিতাল – প্রথম ভাগের প্রথম প্রকাশ ১৮৬৭ সালে। এই বই এর আগের বিশ বছর ধরে পুঁজিবাদ নিয়ে মার্ক্সের মৌলিক চিন্তাভাবনার ফসল।  

দাস কাপিতাল মোটের ওপর পুঁজিবাদের সমালোচনামূলক একটা লেখা। পুঁজিবাদের এই ধরণ বা ওই ধরণ নয়, এই বই লেখার সময়ে মার্ক্সের উদ্দেশ্য ছিল সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদের সেইসব লক্ষণগুলোকে দাগিয়ে দেওয়া, যাদের নজর করলে দেশকালনির্বিশেষে যে কোনও ধরণের পুঁজিবাদকে আমরা দেখলেই চিনতে পারব। এরকম বিশাল একটা ক্যানভাস নিয়ে পুঁজিবাদের এমন একটা সার্বিক অথচ বিমূর্ত আলোচনার কারণেই সম্ভবত দাস কাপিতাল পড়ে ওঠা কিছুটা কষ্টসাধ্য।

পুঁজিবাদের এরকম একটা ক্ষুরধার সমালোচনার অর্থ যে সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে পাঠক, আপনি, এবং লেখক, আমি রয়েছি, বেড়ে উঠেছি, যে সমাজকে সমাজ বলে চিনতে-জানতে শিখেছি, তাকেই আক্রমণ করে বসা। আমাদের যে সমস্ত জানাকে আমরা সাধারণ ‘অভিজ্ঞতালব্ধ’ জ্ঞান বলে জেনে-বুঝে এসেছি, বা আমাদের চারপাশের প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন আমাদের শিখিয়ে এসেছে, দাস কাপিতাল পড়তে বসলে তার অনেকগুলোরই বিরোধিতা চোখে পড়ে। দাস কাপিতাল পড়তে গিয়ে ধৈর্য হারানোর এ-ও এক কারণ।

একটা সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসাবে পুঁজিবাদ গড়ে উঠেছে বিগত প্রায় চারশো বছর ধরে। দাস কাপিতাল প্রকাশ হবার পর থেকেই পুঁজিবাদের পুরোহিতেরা মার্ক্সের তত্ত্বকে খারিজ করার চেষ্টা করে এসেছেন। তবু, যে তরুণ আজও মনের মধ্যে দুনিয়াদারী চিনে নেবার দায় অনুভব করেন, এই বই, বা মার্ক্সের তত্ত্বাবলী, আজও তাঁকে ভাবনার খোরাক জোগায়। কিন্তু আজ প্রায় সারা বিশ্বেই তো পুঁজিবাদ সুপ্রতিষ্ঠিত এবং আমাদের জানা অন্যান্য যে কোনও সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার থেকে বলে প্রতিপত্তিতে যোজন যোজন এগিয়ে। তাহলে মার্ক্সসাহেবের এই বই আদৌ পড়ার দরকারটা কোথায়?

চারপাশে যা ঘটছে তার সবটাই যে ভালো হচ্ছে না – বেশির ভাগ লোকেরই অন্তত এই ধারণাটা আছে। আর যাঁরা মনে করেন মানবজাতি আজ বিশাল কিছু সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে (অর্থাৎ উপরের দলের ‘স্রেফ ধারণা’-র অতিরিক্ত যাঁরা আরও একটু খবরাখবর রাখেন), তাঁদের সংখ্যাটাও আজ বড়ো কম নয়। এই চারপাশে ঘটে-চলা বিবিধ অন্যায় আর মানুষের সামনে ঘনিয়ে আসা প্রবল বিপদ, এইসবের কার্যকারণের সবথেকে নিয়মনিষ্ঠ এবং গোছানো বিশ্লেষণ যদি কোথাও থেকে থাকে, তা আছে মার্ক্স-বিরচিত দাস কাপিতালেই। আর কোথাও নয়। দাস কাপিতালকে পড়ে ওঠার দরকারটা ঠিক এখানেই।

তবে, একটা বাক্সের গায়ে অর্থনীতির লেবেল লাগিয়ে তার মধ্যে দাস কাপিতালকে ভরে ডালা ফেলে দেওয়াটা একেবারেই সমীচীন হবে না। অর্থনীতি ছাড়াও এই বইতে একই সঙ্গে রাজনীতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব, দর্শন এবং থেকে-থেকে সাহিত্যেরও (মার্ক্সের লিখনশৈলী কিছু জায়গায় এতটাই সমৃদ্ধ আর ভাব-জাগানিয়া) মিশেল রয়েছে। রয়েছে মার্ক্সের সাহিত্য-আলোচনার শুরুর দিকের উদাহরণও। অর্থ, অর্থাৎ টাকাপয়সা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে বোঝানোর জন্য বইয়ের জায়গায়-জায়গায় তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন শেক্সপীয়ার, গ্যোতে এবং বালজাকের মত মহান কলমকারদের।

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। বুর্জোয়া সম্প্রদায় (আরও ছড়িয়ে বলতে গেলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা) কেমন করে ‘আরও টাকা কামাবো না পুঞ্জিত সম্পদ ভোগ করব’ – এই প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, তা বোঝাতে আর বুর্জোয়াজনের বিশ্বাসযোগ্য ছবি আঁকতে মার্ক্স উদ্ধৃত করছেন মহামতি গ্যোতে-বিরচিত করুণরসের নাটক ‘ফাউস্ত’-এর মুখ্যচরিত্রের বিলাপবাণী – “… কিন্তু বন্ধু দ্বৈতসত্তা পরস্পর দ্বন্দ্বরত আছে সর্বক্ষণ / এক সত্তা অপর্যাপ্ত স্থূল সুখ চায়। / পৃথিবীর যেইখানে ইন্দ্রিয় বিবশ করা বর্ণগন্ধ রাজে / অবুঝ শিশুর মতো সেই দিকে দু’হাত বাড়ায়… (আহমদ ছফাকৃত অনুবাদ)”

ক্রমে আমরা দেখতে পাব, একই দেহের দুটি সত্তার পরস্পরের থেকে দূরে চলে যাওয়াকে (পরস্পর-বিরোধী কর্তব্যের মধ্যিখানে দ্বিধাদীর্ণ মানুষ) মার্ক্স কেমন করে পুঁজিবাদের অন্যতম অভিজ্ঞান হিসাবে ব্যবহার করছেন।

অর্থাৎ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, দর্শন এবং সাহিত্য অধ্যয়ন করে, তাদের উদ্ধৃত করে, মার্ক্স চিনতে এবং চেনাতে চাইছেন এদের গভীরে লুকিয়ে থাকা সোশাল কন্টেন্ট বা সমাজের প্রাণভোমরাকে। আমাদের সুবিধার জন্য এর নাম আমরা রাখলাম ‘সামাজিক সারবস্তু’।

দাস কাপিতালে এহেন প্রাণভোমরার সুলুকসন্ধানের প্রধানতম উদ্দেশ্য হল কেন এবং কীভাবে অর্থ, মুনাফা, পুঁজি ইত্যাকার অর্থনৈতিক কারকেরা সামাজিক সারবস্তুকে দমন করতে চায়, যদিও এদের সকলেরই জনক সামাজিক সারবস্তু নিজেই। এই অর্থ, মুনাফা, পুঁজি ইত্যাদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কী রকমভাবে প্রভাবিত করে রাখে তার সম্বন্ধে আমাদের কিছু ধারণা তো আছেই। দাস কাপিতাল তার সুপ্রশস্ত এবং সুবিন্যস্ত পরিসরে যে ভাবে এই বিষয়গুলোকে ধরে ধরে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাদের সামনে হাজির করে, গড়পড়তা অর্থনীতির চালু কথাবার্তার থেকে তার ব্যাপ্তি ও গভীরতা এতটাই বেশি, যে এই আমাদের ধারণাগুলো ক্রমে আরও স্বচ্ছ হয়ে আসে।

দাস কাপিতালের শুরুটা খানিকটা গোয়েন্দা গল্পের মত। যে সব ছোট ছোট ঘটনা আমাদের সামনে ও চারদিকে ঘটছে (বা ‘ক্লু’ রেখে যাচ্ছে), সেগুলোকে জুড়ে জুড়ে একটা বড় ছবি – যার কথা আমরা হয়ত ভেবেও দেখিনি – দাস কাপিতাল তৈরি করে ফেলে। ইন্সপেক্টর মার্ক্স যখন সিনে এলেন, খুনটা হয়েছে কি হয়নি তখনও আমরা জানি না। কিন্তু খুনটা যে হয়েছেই, কালক্রমে সেইটা আমরা ধরে ফেলতে পারি।

আমাদের ভালো পুজো

Standard

লেখাপড়া তেমন বেশী শিখি নি বলে আমাদের ইশকুলে ছুটি হত খুব। হয়ত খুব ছুটি হত তাই শিখি নি। কে জানে!

আমাদের পুজোর ছুটি শুরু হত মহালয়া থেকে। একেবারে ভাইফোঁটা পর্যন্ত। নিরবচ্ছিন্ন ছুটি।

মহালয়ার দিন কাকভোরে মা ঘুম থেকে তুলে দিত। মানে দেওয়ার চেষ্টা করত আর কী। হুড়মুড়িয়ে বিবর্ণ সাদা মশারির জড়ামড়ি ছেড়ে রেডিওর সামনে প্রথমে বসা। তারপর আধশোয়া। তারপর ঢুলুনি। তখন টিভি ছিল না। মহালয়ার দিন থেকেই যেন সব কেমন ঝলমলে, সুন্দর। যুবক সমিতির প্যান্ডেল প্রায় শেষের পথে – দেখতাম জানলা থেকে। বাবার ভক্তিশ্রদ্ধা ছিল না তেমন কোনোকালেই। জ্যাঠারা কাছের টালিনালার ঘোলা জলে পিতৃতর্পণ সেরে ফিরত। তারপর ছোট উঠোনে বসত আড্ডা। সেখানে আমি, দাদা, আমার বাকী সব জ্যাঠতুতো দাদা-দিদিরা। উৎসবের শুরু।

তবু আমার পুজো মানে মামাবাড়িই। দাদু এসে আমার বড়ো জ্যাঠা-জ্যেঠিমার থেকে মায়ের পিতৃগৃহে যাবার অনুমতি নিয়ে যেত, মনে আছে। আমার পিতামহ গত হয়েছেন আমার বাবার ছোটবেলায়। দিম্মা মারা গেছে তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। আমার দেখা প্রথম মৃত্যু। ঠাকুমা দীর্ঘজীবী ও চলচ্ছক্তিহীন হয়েছিলেন, মনে পড়ে।

মামাবাড়িতে পুজো হত। একচালার ঠাকুর আসত পটুয়াপাড়া থেকে। চালকুমড়ো বলি হত। মেজদাদু– দাদুর মেজভাই – রোগা শরীরে বিরাট দস্যুসুলভ অঙ্গভঙ্গি করে সেই বলি দিত – একটা বিশাল খাঁড়া দিয়ে। তবে, দশমীর দিন একশো আটবার দুর্গানাম লেখার পর সেই খাঁড়ায় পেন্নাম দিতে হত। তখন বেশ একটা সমীহের ভাব জাগত মনে। বিসর্জনের পর ঠাকুরের অস্ত্র নিয়ে কাড়াকাড়ি হত একটা। তাতে আমিও থাকতাম। তবে আমি অস্ত্রলোভী ছিলাম বলেই হয় ত মা দুর্গা পুণ্যলোভীদের প্রতিবারই জিতিয়ে দিতেন। আমার ভাগ্যে চিরকাল ছোটখাট কিছু একটা জুটত। ওই চক্রজাতীয় কিছু।

মামাবাড়ির উঠোনে পাম্পঘরের দরজার কাছে ছিল একটা শিউলি গাছ। আর সেই গাছে ছিল ঝাঁক-ঝাঁক শুঁয়োপোকা। সেই থেকে শিউলির কথা উঠলেই, আর কাঞ্চনগাছের (ওটা ছিল আমাদের বাড়িতে), আমার আগে শুঁয়োপোকার কথাই মনে হয়।

একেবারে ছোট ছিলাম যখন, তখন একা থাকা হত না। মানে মামাবাড়িতে। তাই ষষ্ঠী থেকে দাদা বডি ফেললেও আমি যেতাম সপ্তমীর দিন। মায়ের হাত ধরে। একবার টানা রিকশা থেকে পড়ে গেছিলাম বলে হেঁটেই যেতে হবে। ভয়টা মায়ের ছিল। আমার নয়। মা এখনও ভয় পায় অবশ্য। আমাকে, দাদাকে নিয়ে। সে সব নানান অমূলক ভয়।

মামাবাড়ি আমার ছিল সে-কালের বড়োলোকের বাড়ি। দাদুর বাবা, আমার প্রমাতামহ ডক্টর অমরেশ্বর ঠাকুর ছিলেন বংশানুক্রমে শ্রীচৈতন্যের মাতুলবংশীয়, আর পালি আর সংস্কৃতের ডবল এম এ, পণ্ডিত মানুষ। বুড়োদাদুর স্মৃতি আমার খুব তাজা নয়। আমার বছর ছয়-সাত বয়েসে তিনি চক্ষু মোদেন। কিন্তু স্মৃতি যেটুকু আছে, তাতে মনে পড়ে – উনি আদর করে কেন যেন আমায় ‘বাইঞ্চত’ বলে ডাকতেন। তখন খুবই ছোট ছিলাম বলে এই স্নেহের ডাকের মর্ম বুঝি নি। যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ চেয়ার প্রোফেসর ডক্টর অমরেশ্বর ঠাকুর সে-কালে বড়োলোকই ছিলেন। তিনতলা বাড়ি বানিয়েছিলেন কালীঘাটের সদানন্দ রোডে।

তা সেই ডক্টর অমরেশ্বরের বড়ো ছেলে রবীন্দ্রনাথ – হ্যাঁ, ঠাকুরই – আমার মায়ের বাবা। আট সন্তানের জনক – যার দু’জন শৈশব ও কৈশোরে মৃত। জীবিতদের মধ্যে বড়োমামা ততদিনে অ্যামেরিকাপ্রবাসী। মেসোর কাজের সুবাদে ছোটমাসী দিল্লীবাসিনী। ছোটমামা পড়াশোনা করছে ফলে প্রায় বেকার। আর মাসীরা আর আমার মাসতুতো দাদারা। পুজো মানে মামাবাড়িতে গিয়ে এই মাসতুতো দাদাদের সকলের সঙ্গে দেখা হওয়া। আর ছোটমামার সঙ্গে ঘুরঘুর।

তখন টেস্ট ক্রিকেট চলত ওই সময়। বিদেশের কোনও দল ভারতে আসত, আর ওই সময়ের খেলাটা হত ইডেনে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে মায়ের হাত ধরে মামাবাড়ি যাবার পথে প্রচুর ফড়িং-এর ওড়াউড়ি দেখতাম। আর মামাবাড়ির ভারত টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ – যতক্ষণ ভালো লাগে ততক্ষণ। টিভিতেও বুঝতাম – ইডেনভর্তি ফড়িং। সে খেলার থেকে উঠলে নিজেদের খেলা। নীচের উঠোনে ক্রিকেট। আর আপেল বেলুন কিনে সেই দিয়ে ঘরে হ্যান্ড ক্রিকেট। ওয়ান-ড্রপ আউট ছিল! সে এক সাংঘাতিক আকর্ষণের ব্যাপার।

যাবার পথে ডানদিকে সাতাশ পল্লীর পুজো যেখানে আমার বড়োজ্যাঠা পুরোহিত। বড়োজ্যাঠাই শিখিয়েছিল – দুর্গাঠাকুরের গায়ের রঙ হবে অতসী ফুলের মতন। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখে বেড়াতাম যখন – তখন চোখটা সেদিকেও থাকত। নাহ, এ যেন একটু বেশী গোলাপী, বা একটু বেশী সাদাটে – এইসব স্বগত-মন্তব্য করতাম। জ্যাঠা নিজে বেশীদূর পড়াশোনা করতে পারে নি। কিন্তু জ্যাঠার সঙ্গে কথা বলতে এলে কেউই সেটা বুঝতে পারত না।

সাতাশ পল্লী ফেলে সামনে রেণুকা রায়ের বাড়ি ছেড়ে বাঁদিকে ঘুরলে ডাক্তার জ্যেঠুর চেম্বার ফেলে, সুরেনদার টেলারিং-এর দোকান পার করে, অন্ধ্র ইশকুল (বলতাম অন্ধস্কুল) ছাড়িয়ে চৈতন্য রিসার্চ ইন্সটিট্যুট। রাস্তা পেরিয়ে বচ্চন সিং-এর ধাবা। তারপর ডিউক-পিনাকীর পিনাকীর বাড়ি। সেখানে দেখি ফিয়াট গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সুভাষ ভৌমিক। চোখে কালো চশমা। রাজপুত্তুরের মতন চেহারা তখন।

উল্টোদিকে বরুণদার ব্যায়ামাগার – মন্দ লোকে যাকে বলত নেশাভাঙের আখড়া। ছাড়িয়েই ঘোষাল ডাক্তারের চেম্বার। আমাদের শৈশবের বিভীষিকা ছিলেন ডাক্তারবাবু! তারপরেই দিলীপ স্মৃতি সংঘ – যার সদস্যেরা সকলেই মূক ও বধির। ওইটাই প্রথম ডাকের সাজের ঠাকুর হিসেবে চোখে পড়ত। দিলীপ স্মৃতি পেরিয়ে, তপন থিয়েটারের নহবতের আর্ট ডিজাইন দেখতে দেখতে আর খরখরে দেওয়ালে হাত দিয়েই মায়ের ধমক খেয়ে সিধে রাস্তায় চলতে চলতে, বাঁদিকের মহাশক্তির পুজোর প্যান্ডেলে উঁকি মারতে মারতে পৌঁছে যেতাম মামাবাড়ি।

তবে, পুজোর আসলি মজা শুরু হত দিনের আলো নিবলে।

মামাবাড়ির দোতলার বারান্দার নীচে আরও একটা ছোট বারান্দা ছিল। বারান্দা মানে, সেটা নীচের একটা ছোট ঘরের ছাদ। সন্ধ্যে হলেই বেঞ্চ পেতে সেইখানে বসে পুজো দেখা। আমি, দাদা আর ছোটমামা – আমাদের আসন বাঁধা। শ্যামাপোকার প্রবল অত্যাচার সয়েও সেইখানে বসে একদিকে শুনছি সারি সারি মানুষের কথাবার্তাহুল্লোড়। একদিক থেকে ভেসে আসছে কাচের কোল্ড ড্রিঙ্ক বোতলের গায়ে ওপেনার ঘষার রিনরিন শব্দ। আর শুনছি ডিফেন্স ইউনিটে ‘চোখের জলের হয় না কোনও রঙ’, সবুজ সংঘে ‘পেয়ার করনেওয়ালে পেয়ার করতে হ্যায় শান সে’। বাঙালি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্বন্ধে ততদিনে অবহিত হলেও সেই ঐতিহ্য যে রবীন্দ্রনাথ-কেন্দ্রিক সেই বোধ তার তখনও হয় নি। ফলে অনায়াসে ‘আপ জ্যায়সা কোই মেরে জিন্দগী মেঁ আয়ে’ আর ‘অবাক পৃথিবী’ তখন কানে আসত একইসঙ্গে।

ওই বারান্দায় বসে বসে অবাক হয়ে দেখতাম, মুখে একটা বিড়ি ঠুসে নানারঙের চক দিয়ে রাস্তায় কালীঠাকুরের ছবি আঁকছেন আদুড় গায়ে এক শিল্পী। বিস্ময়ের শেষ থাকত না।

নীচে মামাবাড়ির মূল গেটের সামনেও একটা জমায়েত বসত। তাদের অবস্থা ভালো ছিল তো বটেই, সে নিয়ে গর্বও ছিল খুব। আমাদের আত্মীয় হলেও কিভাবে বুঝে গেছিলাম – আমরা ওখানে বসলে তারা পছন্দ করত না।

ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা তো ছিলই। সকালের পলিয়েস্টার জামায় ঘামের গন্ধ তাড়াতে মেলে রাখা হয়েছে দড়িতে। সেই দড়ির থেকে টান মেরে সেই জামা পেড়ে সন্ধ্যেয় আবার বেরোনো। সঙ্গে ব্যানলনের প্যান্ট। ছোট হয়ে গেলেও সহজে ছিঁড়ত না বলে আমাদের অস্বচ্ছল পরিবারে তার কদর ছিল।

তখন ওই অঞ্চলের ঠাকুরের মধ্যে বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল সংঘশ্রী-র ঠাকুরের। চিরাচরিত দুর্গামূর্তি ছেড়ে ওরা করত নতুন নতুন মডেলের প্রতিমা। তার মধ্যে অম্বা-অম্বিকা-অম্বালিকা সংক্রান্ত কিছু একটা একবার ছিল – মনে আছে। আর প্রতিমাগুলো বসানো থাকত নানান লেভেলে, যাতে করে ওই বয়েসের আমার মনে বেশ একটা বিভ্রম তৈরী হয়ে যেত। বেশ গতিময় ব্যাপার হত আর কী। সংঘশ্রীতেই প্রথম আলাদা আলাদা পুরুষ-মহিলা লাইন দেখেছি মনে হয়।

সংঘশ্রী যদি মডেলের কেরামতিতে এগিয়ে থাকে, আলোকসজ্জায় এগিয়ে থাকত মুক্তদল। হাঁ করে গিলতাম সেইসব। আর ফরোয়ার্ড ক্লাবের পুজোতে থাকত বিশাল প্রতিমার অবাক-রূপ।

এরই মধ্যে কখনও ছোটমামা নিয়ে যেত কলেজ স্কোয়্যার আর মহম্মদ আলী পার্ক – যেখানে আলোতে-কারুকাজে-অবয়বে ঢের বিস্ময় অপেক্ষা করে থাকত আমাদের জন্য। ঠাকুর দেখার পর হয়ত পুঁটিরাম। একবার একটা পানের দোকান দেখেছিলাম – যাতে প্রচুর নামী লোকের ছবি। মহম্মদ রফির কথা মনে আছে। তবে একমাত্র তিনিই ছিলেন না – মনে আছে সেটাও।

দশমীর দিন সন্ধ্যেয় মনখারাপ নিয়ে বারান্দায় বসে ঠাকুর বিসর্জন দেখতাম। পার্ক সার্কাসের অসুরের চেহারা খুব তাগড়াই হত – সেটা মনে আছে। মনখারাপের কারণ ছিল – পরদিন বাড়ি ফিরে যাওয়া। আবার পড়াশুনো শুরু হয়ে যাওয়া।

এই এখন চোখ বুঁজে ভাবলে দেখি – ঝুলন্ত বাল্বের সারি বড়ো রাস্তার ধারের বাড়িগুলোর ছাদ থেকে। কোনোটা সবুজ তো কোনোটা হলুদ সেলোফেনে মোড়া। যাদের বাজেট বেশী, তাদের সজ্জায় জায়গা পেত চন্দননগরের আলো, তাতে মনীষীদের ছবিই বেশী। দু-চারটে জোকার-টোকারও থাকত। পুজো শেষ হলে সকালে দেখতাম – ওই সেলোফেনের মধ্যে মরে জমে আছে অসংখ্য শ্যামাপোকা।

আমার ভালো পুজো নিয়ে লেখার অছিলায় উপুড় করলাম মৃত স্মৃতিদের সঞ্চয়। আলোর সেলোফেনের মোড়কের মতন পরিত্যক্ত, অবিয়োজ্য।

(লেখাটি ছয়লাপ ওয়েবপত্রিকার উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত। এইখানে ক্লিক করলে লেখাটি পত্রিকার পাতায় পড়া যাবে।)